![]()
আহমেদ তোফায়েল
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পালে নতুন হাওয়া দিচ্ছে ‘একাডেমিক এন্টারপ্রেনারশিপ’ বা উচ্চশিক্ষায় উদ্যোক্তাবৃত্তি। প্রথাগত তাত্ত্বিক পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন এমন দক্ষ জনশক্তি তৈরির দিকে ঝুঁকছে, যারা কেবল চাকরির পেছনে ছুটবে না, বরং নিজেরাই তৈরি করবে নতুন কর্মসংস্থান। গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ মনিটর (জিইএম) ২০২৫-২৬-এর বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উচ্চশিক্ষায় এই রূপান্তরের গুরুত্ব। বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়ার অধ্যাপক নাতাশা শার্লিয়ার মতো ব্যক্তিদের হাত ধরে শিক্ষা ও বাণিজ্যের যে মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে, তা আধুনিক অর্থনীতির এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করার পর কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া বর্তমান বিশ্বের জন্য আর যথেষ্ট নয়। জিইএম-এর ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি শিক্ষার্থীদের ব্যবসা শুরু ও তা পরিচালনার প্রকৃত দক্ষতা দিতে পারে, তবেই শিক্ষা সার্থক হয়। আর এই শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন শ্রেণিকক্ষে এমন শিক্ষকরা পাঠদান করেন যাদের নিজেদের বাস্তব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বাস্তবতার একটি জীবন্ত উদাহরণ ক্রোয়েশিয়ার জোসিপ জুরাজ স্ট্রোসমেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক নাতাশা শার্লিয়া। তিনি একইসাথে গবেষক এবং একটি সফল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।
দুই দশক আগে ক্রেডিট-রিস্ক মডেলিং নিয়ে পিএইচডি করার সময় নাতাশা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ছোট ব্যবসার ঋণযোগ্যতা নির্ণয়ে ব্যবহৃত গাণিতিক সূত্রগুলো কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ঐতিহাসিক আর্থিক তথ্য দিয়ে যে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব, এই ধারণা থেকেই ২০০৩ সালে সরকারি গবেষণা অনুদান নিয়ে তিনি শুরু করেন ‘আলফা স্কোর’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। অধ্যাপক শার্লিয়া সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে জানান, বিভিন্ন ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও শুরুতে কোনো সাড়া মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রে তারা মডেল উপস্থাপন করে ফেরার পর আর কোনো যোগাযোগ করা হতো না। কিন্তু হার না মানার মানসিকতা এবং সহজ ভাষায় জটিল গাণিতিক বিষয় উপস্থাপনের কৌশলে ২০০৫ সালে প্রথম সাফল্য আসে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মেলে প্রথম চুক্তি। বর্তমানে ১৩ জনের একটি শক্তিশালী দল নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানটি এআই ব্যবহার করে শিক্ষা, পুষ্টি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে।
অধ্যাপক শার্লিয়ার এই জয়যাত্রা কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি একটি বড় সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করে। বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক গবেষণাকে ব্যবসায় রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা নীতিমালা নেই। গবেষকদের ওপর পাঠদান ও গবেষণার যে চাপ থাকে, তাতে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো মানসিক বা শারীরিক অবকাশ খুব কমই পাওয়া যায়। মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (আইপি) শেয়ারিং নিয়ে অস্পষ্টতা আজও অনেক মেধাবী গবেষককে পিছপা করে রাখে। নাতাশার মতে, একাডেমিক উদ্যোক্তাবৃত্তি বিষয়টি এখনো অনেকটা ব্যক্তিগত লড়াইয়ের মতো। যেখানে নির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ নেই, নেই প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা। অথচ গবেষণাকে যদি বাস্তবের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, তবে তা যেমন গবেষকের জন্য তৃপ্তিদায়ক, তেমনি সমাজের জন্য কল্যাণকর।
এদিকে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক উদ্যোক্তা চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় এক মিশ্র পরিস্থিতি। জিইএম-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের ৫৩টি অর্থনীতি বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫৭ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করছে। ২০১৯ সালে চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির অংশগ্রহণে এই ব্যাপ্তি ছিল সর্বোচ্চ। তবে কোভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কায় ২০২০ ও ২০২১ সালে বৈশ্বিক উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিছুটা সংকুচিত হলেও ২০২২ সাল থেকে তা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ-আয় ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোর মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতায় ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। যদিও চীনের অনুপস্থিতির কারণে পরিসংখ্যানে কিছুটা প্রভাব পড়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্যোক্তাদের ভূমিকা আরও জোরালো হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, উচ্চ জিডিপি সম্পন্ন দেশগুলোর জিইএম জরিপে অংশগ্রহণের হার বেশি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সমৃদ্ধ অর্থনীতিগুলো এখন উদ্যোক্তাবৃত্তিকে টেকসই উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। নীতি নির্ধারকদের জন্য এই বার্তার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে অর্থায়ন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং সহায়ক আইনি কাঠামো বিদ্যমান থাকবে।
অধ্যাপক নাতাশা শার্লিয়া মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সমাজের এক নতুন সামাজিক চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। যেখানে গবেষণার তিনটি স্তম্ভ থাকবে—শিক্ষা, গবেষণা এবং জনসেবা। আর এই তিনটির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে উদ্যোক্তাবৃত্তি। তিনি তার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কেবল তাত্ত্বিক বিষয় পড়ান না, বরং ঝুঁকিকে ভয় না পেয়ে তা মোকাবিলার বিশ্লেষণাত্মক সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। তার মতে, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জনই হবে ভবিষ্যৎ পেশাজীবীদের প্রধান শক্তি।
পরিশেষে, একাডেমিক উদ্যোক্তাবৃত্তি কেবল ব্যক্তিগত লাভের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার পথ। নাতাশা শার্লিয়ার মতো গবেষক-উদ্যোক্তারা যখন শ্রেণিকক্ষ ও করপোরেট বোর্ডরুমের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেন, তখন গবেষণার প্রতিটি গাণিতিক সূত্র হয়ে ওঠে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি গবেষণাকে কেবল লাইব্রেরির তাকে বন্দি না রেখে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয়, তবেই আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। একটি উন্নয়নশীল বা রূপান্তরকালীন অর্থনীতির জন্য এই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়ই হতে পারে সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: জিইএম ২০২৫/২০২৬ গ্লোবাল রিপোর্ট।