![]()
নাবিল আহমেদ দিপ
হাইলাইটস
৩০ এপ্রিল একদিনেই ব্যাংকটির শেয়ার দর ৫.৭১ শতাংশ কমেছে
২০২৪ সালে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে এটি ছিল প্রায় ২১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা কমেছে প্রায় ১৭০ কোটি মুনাফা কমে যাওয়ায় শেয়ার প্রতি আয় ১.৬৬ টাকা থেকে কমে মাত্র ৩২ পয়সায় নেমে এসেছে
প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণের হার কমেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার গত কয়েক মাসে ৪০.৮২% থেকে কমে ৩৫.৭৬%-এ দাঁড়িয়েছে
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র শেয়ার দরে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ব্যাংকটির শেয়ার দর একদিনেই ৫.৭১ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৯.৯ টাকায়। দীর্ঘ সময় ধরে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের (ফেস ভ্যালু) আশেপাশে অবস্থান করা এই ব্যাংকের শেয়ার দর এখন ৫২ সপ্তাহের সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। মুনাফায় বড় ধরনের ধস এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপই এই পতনের মূল কারণ বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এপ্রিল মাসের শেষ কার্যদিবসে সাউথইস্ট ব্যাংকের লেনদেন শুরু হয়েছিল ১০.৮ টাকায়। তবে দিনভর অস্থিরতার পর সমাপনী মূল্য দাঁড়ায় ৯.৯ টাকা। ওই দিন শেয়ারটির মূল্যসীমা ৯.৮ থেকে ১০.৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। দিনশেষে লেনদেনকৃত শেয়ারের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ১৯ হাজার ৩৩২টি, যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০৪ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকায়। ৫২ সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেয়ারটির সর্বোচ্চ দর ছিল ১১ টাকা এবং সর্বনিম্ন ছিল ৬.৬ টাকা। বর্তমান ৯.৯ টাকার দর মূলত নিম্নমুখী প্রবণতাকেই স্পষ্ট করছে।
সাউথইস্ট ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কর পরবর্তী নিট মুনাফায় বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। ২০২০ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ২১৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল (২১৩ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার টাকা)। তবে ২০২৪ সালের সমাপ্ত বছরে এই মুনাফা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা কমেছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। মুনাফার এই বিশাল ব্যবধান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। ফলে শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) যা ২০২৩ সালে ১.৬৬ টাকা ছিল, তা ২০২৪ সালে মাত্র ০.৩২ টাকায় নেমে এসেছে।
ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ১,৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১,৩৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ৩০ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, নিরিক্ষীত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে ব্যাংকটির পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ৩০.৯৪-এ। ২০২৪ সালে শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য ২৩.৫৯ টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছরগুলোতে প্রায় ২৫ টাকার উপরে ছিল। এই সূচকগুলো নির্দেশ করছে যে, ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক ভিত্তি ও সম্পদ মূল্যায়নে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিগত কয়েক মাসে সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ার ধারণের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে শেয়ার ছিল ৩২.৪৫ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৩১.৩১ শতাংশে। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণ ৪০.৮২ শতাংশ থেকে কমে ৩৫.৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, বড় বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে তাদের পোর্টফোলিও থেকে এই ব্যাংকের শেয়ার কমিয়ে ফেলছেন। এর বিপরীতে সাধারণ জনগণের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ ২৫.৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১.৬৬ শতাংশ হয়েছে। সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ছেড়ে দিলে বাজারে ওই শেয়ারের অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।
লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে সাউথইস্ট ব্যাংক অতীতে বেশ উদার ছিল। ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার এবং ২০১৬ সালে ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লভ্যাংশের হার নিম্নমুখী। ২০২৩ ও ২০২২ সালে ৬ শতাংশ নগদ ও ৪ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের সমাপ্ত বছরের জন্য এখনো লভ্যাংশের চিত্র পরিষ্কার না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। এছাড়া ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদী ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৩ হাজার ৪৮৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাউথইস্ট ব্যাংকের বর্তমান দরপতন কেবল বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন নয়, বরং এর পেছনে গভীর ব্যবসায়িক মন্দার প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে নিট মুনাফায় প্রায় ৮০ শতাংশ ধস এবং সম্পদ মূল্যের হ্রাস পাওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। যদি ব্যাংকটি তাদের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালন ব্যয় কমিয়ে নিট মুনাফা পুনরায় আগের অবস্থায় নিতে না পারে, তবে শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের নিচে স্থায়ীভাবে অবস্থান করার আশঙ্কা রয়েছে।
২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ‘এ’ ক্যাটাগরির এই ব্যাংকটি বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। একদিকে উচ্চ দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং অন্যদিকে নিম্নমুখী মুনাফা—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বন্ধ না হলে এবং আগামী আর্থিক প্রতিবেদনে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন না এলে সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ার দর আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।