![]()
ইরানে আকস্মিক বিমান হামলার ৩২ দিন পর, ১ এপ্রিল হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ নিয়ে নতুন কোনো তথ্য না দিলেও তিনি ইতিহাসের উদাহরণ টেনে দেখানোর চেষ্টা করেন—৩২ দিনকে দীর্ঘ সময় হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং ইরাক যুদ্ধের সময়কাল উল্লেখ করে বোঝাতে চান, বর্তমান সংঘাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা এত সরল নয়—এর কোনো নির্দিষ্ট শুরু বা শেষ নেই, বরং এটি ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক ঘটনার অংশ।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ—ভেনেজুয়েলায় অভিযান, কিউবায় তেল অবরোধ, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা এবং ইরান যুদ্ধ—সব মিলিয়ে একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছে, যেখানে সংঘাতগুলো অনেকটা সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষণস্থায়ী ‘কনটেন্ট’-এর মতো দ্রুত আসে ও চাপা পড়ে যায়।
হোয়াইট হাউসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রমেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে। বিমান হামলার ভিডিওর সঙ্গে বিনোদনধর্মী কনটেন্ট যুক্ত করে প্রচারণা চালানো হয়, যা যুদ্ধের গম্ভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করলে—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব সামনে আসা এবং জ্বালানির দাম বাড়ার পর—এই প্রচারণার জায়গা নেয় বাস্তব উদ্বেগ।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার ঘনিষ্ঠ মহল, এমনকি ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেছেন। তিনি তার পদত্যাগপত্রে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’-এর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন এবং এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রভাবশালী লবির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ এখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। ৯/১১–এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িত থাকলেও, এসব যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে না। ফলে জনমতও তুলনামূলকভাবে নীরব থাকে।
এমআইটির অধ্যাপক অ্যাডাম বেরিনস্কি মনে করেন, যুদ্ধ নিয়ে জনমত অনেকটাই রাজনৈতিক বিতর্কের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য গোপন রাখা, কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না থাকা এবং ঋণের মাধ্যমে যুদ্ধের অর্থায়ন—এসব কারণে যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় জনগণের কাছে স্পষ্ট হয় না।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ—বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারের ফলে—ঝুঁকি ও প্রাণহানির বিষয়টি আরও সীমিত হয়ে গেছে। এতে যুদ্ধের নৈতিকতা এবং জনসম্পৃক্ততা দুটিই বদলে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের যুদ্ধংদেহী অবস্থান এই বাস্তবতারই একটি চরম প্রতিফলন। যুদ্ধ এখন অনেকাংশেই বাস্তবতার চেয়ে ‘বর্ণনা’ বা ‘ন্যারেটিভ’-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে—যেখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু পর্দার সামনে থাকা এক ক্লিকে।
পাঠকের মন্তব্য