![]()
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাটো মিত্রদের অনীহা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো “বোকামি” করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, যার ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
মিত্রদের সহায়তা প্রয়োজন নেই—তবু অসন্তোষ
হোয়াইট হাউসে মাইকেল মার্টিন–এর উপস্থিতিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটোর বেশিরভাগ সদস্য দেশ তাকে জানিয়েছে যে তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
তার দাবি, অনেক মিত্র দেশ এই সংঘাতকে “অবৈধ” বলে মনে করছে।
তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসলে এই যুদ্ধে মিত্রদের সহায়তার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও তার মতে, মিত্রদের সেখানে উপস্থিত থাকা উচিত ছিল।
ওভাল অফিসে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন,
ন্যাটোর কাছ থেকে আমাদের কোনো সাহায্য প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল।
মাইন-সুইপার পাঠাতে অনীহা
পারস্য উপসাগরে মাইন পরিষ্কার করার জন্য যুদ্ধজাহাজ বা মাইন-সুইপার পাঠাতে ন্যাটো মিত্রদের অনীহা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
যদিও তিনি এটিকে খুব বড় বিষয় নয় বলে উল্লেখ করেন, তবুও এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “অন্যায় আচরণ” বলে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতি ট্রাম্পের সমালোচনা
এই প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের সমালোচনাও করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক সব সময় সবচেয়ে ভালো ছিল।
তার মতে, চলমান এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
ইউরোপের অনীহা স্পষ্ট
অন্যদিকে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে তারা এই সংঘাতে জড়াতে চায় না।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ফ্রান্স এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নয় এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার সামরিক অভিযানে তারা অংশ নেবে না।
একই ধরনের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান এই সংঘাত ইউরোপের যুদ্ধ নয় এবং এ বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে কোনো পরামর্শও করা হয়নি।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হলো হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথ দিয়ে পণ্য পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ভারত ও চীনগামী হাতে গোনা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজ চলাচল খুবই সীমিত হয়ে গেছে।
এমনকি এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকারও হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও মতবিরোধ
এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টার–এর পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি এবং প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
তবে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সতর্কতার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করার পরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তেহরান থেকে বড় ধরনের হুমকির আশঙ্কা ছিল।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
এদিকে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তেল আবিব–এর কাছে ইরানের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুইজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার এবং কুয়েত–এর বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরাজয় স্বীকার না করা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির কোনো পরিকল্পনা নেই।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়—বরং তা বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
পাঠকের মন্তব্য