![]()
বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধের চিঠি এখন ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক উত্তাপ ও সম্প্রসারিত মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এ চিঠি শুধু একটি আইনি আবেদন নয়—এটি দুই দেশের সম্পর্ক, বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং ক্ষত-বিক্ষত মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার বহুমাত্রিক প্রতিফলন।
বুধবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশ সরকার যে অনুরোধ পাঠিয়েছে, তা চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতাসহ বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য পূরণে আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকব।”
অভ্যুত্থানের পর থেকে টানা উত্তেজনা
গত বছর দেশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। রাজনৈতিক সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যে পালিয়ে যাওয়া এই নেত্রীকে ফেরত চেয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দুইবার অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু তখন ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।
এই সময়কালে দেশের অসংখ্য পরিবার বিচার ও নিরাপত্তার জন্য অপেক্ষায় ছিল। আন্দোলনে নিহতদের স্বজনরা, নিখোঁজদের আত্মীয়রা এবং সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়
১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের একটি বড় ধাপ সামনে এলেও, দণ্ডপ্রাপ্তদের বিদেশে অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রায়ের পরপরই বাংলাদেশ আবারও, তৃতীয়বারের মতো, ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠায়। চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয় যে বিচারিক প্রক্রিয়ার সমস্ত ধাপ শেষ করে আদালত রায় দিয়েছে, আর এখন দুই দেশের সই করা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভারতকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
ভারতের সতর্ক প্রতিক্রিয়া
চিঠির প্রত্যক্ষ জবাব না দিলেও ভারত ইতোমধ্যে বলেছে, তারা বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নয়—বরং একটি আন্দোলনের শহীদ পরিবার, আহত মানুষদের ন্যায়বিচার এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরীক্ষার মুহূর্ত।
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি নিতে আরও সময় লাগতে পারে। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে দ্রুত প্রত্যর্পণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
জনগণের আকুতি—বিচার ও স্থিতিশীলতা
যেসব পরিবার আন্দোলনের সময় প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে, তাদের কাছে এই প্রত্যর্পণের প্রশ্ন গভীর যন্ত্রণার, আবার আশারও। দেশের সাধারণ মানুষও চাইছে সহিংসতা, বিভেদ ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘসূত্রতা শেষ হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
পাঠকের মন্তব্য