![]()
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সংকট মোকাবিলায় এবং পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সরকার এগিয়ে এসেছে বড় একটি উদ্যোগ নিয়ে। ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন ব্যাংক গঠনের জন্য সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা—সবটাই নগদে।
এর আগে পরিকল্পনা ছিল, ১০ হাজার কোটি টাকা নগদে এবং বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে তোলা হবে। কিন্তু সুকুক ইস্যু সময়সাপেক্ষ হওয়ায় পুরো মূলধন এখনই নগদ অর্থে ছাড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে—আজকের মধ্যেই প্রস্তাবিত মূলধনের ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড় হতে পারে।
পাঁচ রুগ্ণ ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান
আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া পাঁচ ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নতুন ব্যাংকের অধীনে আনতে গত সেপ্টেম্বরে সরকার অনুমোদন দেয়।
একের পর এক অনিয়ম, তারল্যসংকট এবং আমানত প্রত্যাহারের চাপ সামাল দিতে না পেরে এসব ব্যাংক টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা, কর্মচারীদের চাকরি রক্ষা এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার জন্য সরকার এগিয়ে এসেছে—এমন মন্তব্য করেছেন নীতিনির্ধারকরা।
ইতোমধ্যে আরজেএসসি থেকে নামের ছাড়পত্র, সংঘবিধি ও সংঘ স্মারক অনুমোদন এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার বেশিরভাগই সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ব্যাংকের নিবন্ধন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স অনুমোদন আগামী রোববারই চূড়ান্ত হতে পারে।
সুকুক বন্ড বাতিল: সময় বাঁচাতে সম্পূর্ণ নগদ সহায়তা
নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন হিসেবে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারের।
সুকুক ইস্যুর পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় মূলধন প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও স্বচ্ছ। এতে নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে সংকটে থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা দ্রুত আশ্বস্ত হতে পারবেন।
বড় আমানতকারীদের অর্থ শেয়ারে রূপান্তর: ‘বেইল-ইন’ প্রক্রিয়া
প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ‘বেইল-ইন’ প্রক্রিয়ার আওতায় শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
এর অর্থ—গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের পাওনার একটি অংশ নতুন ব্যাংকের শেয়ারে পরিণত হবে।
পরে পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করা হবে ধাপে ধাপে।
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে সরকার। তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
১৮ হাজার কর্মী, বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেতন ব্যয়: মানবিক দৃষ্টিকোণেই ‘একীভূতকরণ’
পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৮,০৮১ জন।
শুধু বেতন–ভাতা বাবদ তাদের ব্যয় বছরে ১,৯৭৭ কোটি টাকা।
নতুন ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে বেকারত্বের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন—
“নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। খুব শিগগিরই এটি চূড়ান্ত হবে।”
নতুন ব্যাংক চলবে বেসরকারি কাঠামোতেই, তিন বছর পর হতে পারে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত
পাঁচ ব্যাংকের সম্পদ ও দায় সরকারের অধীনে গেলেও নতুন ব্যাংকটি পরিচালিত হবে বেসরকারি ব্যাংক কাঠামোতে। সরকারের বড় অংশীদারিত্ব থাকলেও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি নীতিই অনুসৃত হবে।
যদি তিন বছরের মধ্যে নতুন ব্যাংকটি লাভজনক হয়ে ওঠে—তাহলে এটিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে।
আর ব্যাংকটি ‘ঘুরে দাঁড়াতে’ সক্ষম হলে সরকার ধীরে ধীরে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ: সংকটে থাকা আমানতকারীদের জন্য বড় স্বস্তি
পাঁচ ব্যাংকের বহু ক্ষুদ্র আমানতকারী দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তায় ছিলেন—তাদের কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা ও জীবনযাত্রার ঝুঁকি কমাতে এই সমন্বিত উদ্যোগ বড় স্বস্তির বার্তা।
মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলো একীভূত হওয়ায় আমানত সুরক্ষা, কর্মসংস্থান রক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা—সবই একসঙ্গে নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য