![]()
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের সফল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ২০২২ সালেই বাংলাদেশ বিদ্যুচ্চালিত রেলের যুগে প্রবেশ করে। সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে এবার আরও বড় এক স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ রেলওয়ে—মূল রেলপথে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার রুটে আধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) চালুর মাধ্যমে পরিবর্তন আসবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রুটের পরিবহন ব্যবস্থায়।
এই রুটে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত—চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে। সড়কের যানজট, বাড়তি সময়, অতিরিক্ত খরচ ও মানবিক ভোগান্তির বোঝা প্রতিদিন বহন করতে হয় তাদের। এই যন্ত্রণার মধ্যেই নতুন আলো খুঁজে দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের এই উদ্যোগ। ইএমইউ চালু হলে যাত্রীসেবা দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও মানবিক হবে—বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫২ কিমি রেলে স্থাপিত হবে ওভারহেড ক্যাটেনারি, নির্মিত হবে আধুনিক ওয়ার্কশপ ও দুটি সাবস্টেশন
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো রুটে থাকবে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম, যার মাধ্যমে ট্রেন সরাসরি বিদ্যুৎ পাবে। ফতুল্লা ও টঙ্গী এলাকায় নির্মিত হবে দুটি শক্তিশালী সাবস্টেশন। ইএমইউগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে জয়দেবপুরে গড়ে উঠবে একটি আধুনিক ওয়ার্কশপ—যা দেশের রেল ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত এক নতুন স্তর যুক্ত করবে।
ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের আশা, ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলে ২০২৬–২০৩০ সময়সীমায় বাস্তবায়ন করা হবে মূল কাজ।
৩ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার স্বপ্ন—অর্ধেকই যাবে ইএমইউ কেনায়
এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,৯৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর অর্ধেকের কাছাকাছি খরচ হবে ১৬ সেট ইএমইউ ট্রেন কেনার জন্য—হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ট্রেনের দাম প্রায় ১১১ কোটি টাকা। পাঁচ কোচের প্রতিটি ট্রেনে দেড় হাজার যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে।
ইলেকট্রিক ট্রেন মেট্রোরেলের মতো দ্রুত, নীরব ও পরিবেশবান্ধব—এখন শহর ও শহরতলির মানুষের জীবনযাত্রায় এমন একটি সিস্টেম যোগ হওয়া নিঃসন্দেহে গণপরিবহনে একটি মানবিক পরিবর্তন।
প্রতিদিন দুই লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য—৩০ মিনিট অন্তর ছেড়ে যাবে ট্রেন
রেলওয়ে জানিয়েছে, ইএমইউ চালু হলে নারায়ণগঞ্জ ও জয়দেবপুর দুই প্রান্ত থেকেই প্রতি ৩০ মিনিট পরপর ট্রেন ছাড়বে। শুরুতেই দৈনিক দুই লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট কমবে, সময় বাঁচবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা লাখো মানুষ এই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তব রূপ পাবে বলে আশা করছেন।
তবে বাধা আছে—ঢাকা–টঙ্গী ও টঙ্গী–জয়দেবপুরের ডুয়াল গেজ কাজ সম্পূর্ণ হওয়া জরুরি
এ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করতে হবে ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়াল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর। ২০২৭ সালের জুনে এই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য থাকায় এর আগে নতুন ইলেকট্রিক রেল বাস্তবায়ন শুরু করা কঠিন।
কিন্তু প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন—যত দেরিই হোক, মানুষের জন্য উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে দরপত্র প্রক্রিয়া ও অন্যান্য প্রস্তুতি দ্রুততার সাথে এগিয়ে নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক করিডোরের অংশ হিসেবে এ প্রকল্প একটি বড় ভিত্তি
বাংলাদেশ রেলওয়ের বৃহৎ পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে সম্পূর্ণ বিদ্যুচ্চালিত রেল নেটওয়ার্ক গড়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে মিটারগেজ লাইন থাকা লাকসাম–চট্টগ্রাম ও টঙ্গী–আখাউড়া অংশে ব্রড গেজ না হওয়া পর্যন্ত এই অংশে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন চালু করা যাবে না।
তবুও নারায়ণগঞ্জ–জয়দেবপুর অংশ বাস্তবায়ন হলে পুরো করিডোরের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠবে—যা ভবিষ্যতের দ্রুতগতির, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব রেল ব্যবস্থার দিকে বড় পদক্ষেপ।
যাত্রীকেন্দ্রিক, মানবিক ও আধুনিক রেল ভবিষ্যতের দিকে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট লাঘব, আধুনিক গণপরিবহন নিশ্চিতে এবং পরিবেশবান্ধব রেল ব্যবস্থার লক্ষ্যে এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে এক মানবিক উদ্যোগ। উন্নয়ন কেবল পরিকাঠামো নির্মাণ নয়—মানুষের জীবনকে সহজ করা, নিরাপদ করা ও সময় সাশ্রয় করাই প্রকৃত উন্নয়ন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেই লক্ষ্য অর্জনের দিকে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
পাঠকের মন্তব্য