![]()
মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহুল আলোচিত মামলার ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। রায়ে প্রথমবারের মতো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নির্মমতা, পরিকল্পনা ও সরাসরি হত্যায় অংশগ্রহণের তথ্য। আদালত বলেন—“সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, প্রদীপ ছিলেন এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ও মূল পরিকল্পনাকারী”।
রায়ে উচ্চ আদালত উল্লেখ করেন, ঘটনার রাতে জুতা পরা পা দিয়ে সিনহার বুকের বাম পাঁজরে প্রচণ্ড আঘাত করেন প্রদীপ। এতে তাঁর দুটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। এরপর গলার বাম পাশে পা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন তিনি। প্রসিকিউশনের সাক্ষী, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রমাণ এতে পুরোপুরি সহায়তা করেছে বলে উল্লেখ করেন বিচারপতিরা।
মুদ্রিত হলো ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক ইতিহাস
এই রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এতে একমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের অপর বিচারপতি মো. সগীর হোসেন।
এর আগে গত ২ জুন হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন এবং ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
লিয়াকত আলীর ভূমিকা : নিরস্ত্র মানুষের ওপর পরিকল্পিতভাবে পরপর চার গুলি
পূর্ণাঙ্গ রায়ে পরিদর্শক লিয়াকতকে হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ শুটার হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আদালত বলেন,
“লিয়াকত আলী পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিরস্ত্র ভিকটিমকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে সরকারি পিস্তল দিয়ে শরীরের ওপরের অংশে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরপর চারটি গুলি করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী গুলির আঘাতেই মৃত্যু হয়।”
বিচারিক আদালত যে দণ্ডবিধি ৩০২ ধারায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, হাইকোর্ট মনে করে সেটি যথাযথ ও আইনি মানদণ্ডসম্মত।
ছয়জনের যাবজ্জীবন বহাল : ষড়যন্ত্র ও সহায়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছয়জন হলেন—
-
উপপরিদর্শক নন্দ দুলাল রক্ষিত
-
সাগর দেব
-
রুবেল শর্মা
-
মামলার সাক্ষী নুরুল আমিন
-
মো. নেজামুদ্দিন
-
আয়াজ উদ্দিন
রায়ে বলা হয়, এই ছয়জন হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র, সহায়তা এবং সাধারণ অভিপ্রায়ের মাধ্যমে অপরাধে যুক্ত ছিলেন।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার উপযুক্ত কারণ খুঁজে পায়নি হাইকোর্ট।
ঘটনার পটভূমি : যে রাতে থেমে গিয়েছিল একজন তরুণ সেনা অফিসারের জীবন
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি করে।
পরে মামলার বিচার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শেষ হয়। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি ওই আদালত দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, ছয়জনকে যাবজ্জীবন এবং সাতজনকে খালাস দেন।
বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে গত ২ জুন হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে, যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখন প্রকাশিত হয়েছে।
পরবর্তী ধাপ : আপিল বিভাগে যাবে মামলাটি
রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল বিভাগে আবেদন করবেন। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে এই বহুল আলোচিত মামলার। মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ আশা করছে—ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পথ আরও দৃঢ় হবে।
পাঠকের মন্তব্য