
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইটি) আজ দ্রুতবর্ধমান ও সম্ভাবনাময় এক শক্তিশালী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। একসময় যেখানে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি চাকরি বা বিদেশগমনের মধ্যে—সেই তরুণরাই এখন দেশের ভেতর থেকেই প্রযুক্তির শক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইটি শিল্প, যা দেশের পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
২০০৯ সালে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ঘোষণার পর প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে যে গতি তৈরি হয়েছে, তার ফল আজ দৃশ্যমান। বর্তমানে দেশে ৬,৫০০-এর বেশি আইটি কোম্পানি, ১০ লাখের বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার এবং প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের আইটি-সম্পর্কিত বার্ষিক আয়—এসবই প্রমাণ করে আইটি খাত কত দ্রুত এগোচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার রপ্তানি, কল-সেন্টার সেবা, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল মার্কেটিং—এই পাঁচটি উপখাত এখন দেশের প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটি হিসেবে বাংলাদেশের তরুণরা গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের সেবা দিচ্ছে। শুধু ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকেই বছরে ১.২ বিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থানের সবচেয়ে দ্রুত বিস্তৃত উৎস হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে সফটওয়্যার ও অ্যাপ রপ্তানিতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো জাপান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের এই বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান BPO ও কল-সেন্টার শিল্পও অর্থনীতিতে নতুন গতিশক্তি যোগ করছে। দেশের ২০০টির বেশি সেবা প্রতিষ্ঠান ৫০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাস্টমার সার্ভিস পরিচালনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। অন্যদিকে ই-কমার্সের ব্যাপক বিস্তার দেশের ব্যবসায়িক কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। Daraz, Chaldal, Pickaboo থেকে শুরু করে হাজারো উদ্যোক্তা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন করছেন।
সরকার বিভিন্ন প্রকল্প যেমন LEDP, ShePower, SEIP, শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং সেন্টার এবং বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন ও ইনোভেশন প্রচারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রকল্পের ফলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের তরুণরাও আজ আইটি খাতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আইটি খাতের সামনে যেমন বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে—৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্য, ২০ লাখ নতুন চাকরি, এআই, সাইবার সিকিউরিটি, ব্লকচেইনসহ নতুন প্রযুক্তিখাতে কাজের সুযোগ—তেমনি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, ইংরেজি যোগাযোগ সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনও অতিক্রম করার মতো বড় বাধা।
তবুও সামগ্রিক চিত্র বলছে—বাংলাদেশের আইটি খাত এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হওয়ার পথে। তরুণদের দক্ষতা, প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ এবং সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতে “Made in Bangladesh” সফটওয়্যার, অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবা বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান নেবে—এটাই এখন বাস্তবতার সম্ভাবনাময় অধ্যায়।
পাঠকের মন্তব্য