![]()
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প, যা দেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় খাত, বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট ও সুযোগের যুগে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের বাজারে আমদানিকৃত পোশাকপণ্যের জন্য ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্বচ্ছ এবং ট্রেসযোগ্য করতে হবে, না হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডিপিপি মূলত একটি ডিজিটাল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি পোশাকপণ্যের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইডি—যেমন কিউআর কোড, এনএফসি ট্যাগ বা আরএফআইডি চিপ—প্রদত্ত হবে। এটি একটি নিরাপদ অনলাইন ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যেখানে পণ্যের পুরো লাইফ সাইকেল সংরক্ষিত হবে: কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন প্রক্রিয়া, পরিবেশগত প্রভাব, শ্রমিকের অধিকার, ব্যবহার এবং শেষমেশ পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি।
এর মূল লক্ষ্য হলো:
-
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা
-
নৈতিক ও দায়িত্বশীল উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ
-
শ্রমিক ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা
-
কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি
শ্রমিকদের মানবাধিকার ও নিরাপত্তা
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, এর মধ্যে অধিকাংশ নারী। শ্রমিকদের জন্য নতুন এই নিয়মের অর্থ হলো: তাদের কাজের শর্ত, নিরাপত্তা এবং অধিকার যথাযথভাবে রেকর্ড করা হবে। ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত হলে কোনো কারখানায় শিশু শ্রম, অতিরিক্ত কাজ বা শ্রমিক শোষণ করা হলে তা সহজে চিহ্নিত করা যাবে।
শ্রমিকদের জন্য এটি হিউম্যানিটারিয়ান দিক থেকে একটি বড় পদক্ষেপ। এটি শুধু মানবাধিকার সুরক্ষা নয়, বরং তাদের আয়, শ্রমঘণ্টা এবং নিরাপত্তা মানদণ্ডও উন্নত করবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার চ্যালেঞ্জ
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো এখনও ডিজিটাল অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। তাদের জন্য ডিপিপি বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং ডেটা ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা শ্রমবাজারে এখনও সীমিত। সঠিক বাস্তবায়ন ছাড়া অনেক কারখানা ইউরোপীয় অর্ডার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।”
এছাড়া, নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোকে তথ্য সরবরাহ করতে হবে, যা কখনোই স্বাভাবিকভাবে সহজ নয়। প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, ট্রেনিং এবং সফটওয়্যার খরচও হবে।
পরিবেশগত প্রভাব ও টেকসই উৎপাদন
ডিপিপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পণ্যের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত হবে। কারখানাগুলোর পানির ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খরচ, কার্বন নিঃসরণ সবই মনিটর করা হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াকরণকে উৎসাহ দেওয়া হবে।
বিজিএমইএ পরিচালক শেখ এইচ এম মুস্তাফিজ বলেন, “আমরা টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছি। প্রতিটি পণ্যের তথ্য নিরাপদভাবে ডেটাবেজে রাখা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই তথ্যের মাধ্যমে টেকসইতা এবং কমপ্লায়েন্স যাচাই করবে।”
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন শুধু প্রাকৃতিক সংরক্ষণ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও রপ্তানির ঝুঁকি
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি ইউরোপীয় বাজারে যায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলার ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে গেছে।
ডিপিপি বাস্তবায়নের বাধ্যতামূলক হওয়ার ফলে নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো অর্ডার হারাতে পারে। এতে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে থাকবে।
তবে যারা নিয়ম মেনে চলবে, তাদের জন্য এটি বাজারে নতুন সুযোগের সূচনা। টেকসইতা, স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের পোশাকের মান বৃদ্ধি পাবে এবং ইউরোপীয় বাজারে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
পাইলট প্রকল্প এবং বাস্তবায়ন কৌশল
বিজিএমইএ ইতিমধ্যে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে। উর্মি গ্রুপের একটি কারখানায় এই প্রকল্প চলছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে সাপ্লাই চেইনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দেখা যাবে:
-
তথ্য সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া
-
কারখানা পর্যায়ের বাস্তবায়নের সমস্যা
-
শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ প্রয়োজনীয়তা
-
ডেটা প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা
প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রতিটি ধাপে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পুরো সাপ্লাই চেইনের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা সম্ভব।
দেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ডিপিপি শুধু একটি নিয়ম নয়, এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতকে টেকসই এবং বিশ্বমানের করার একটি সুযোগ। সঠিক বাস্তবায়ন হলে:
-
শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে
-
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে
-
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের মান বৃদ্ধি পাবে
-
নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়বে
-
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে
এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে ভবিষ্যতের বাজারের জন্য প্রস্তুত করবে। তবে সময়ের চাপ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সাপ্লাই চেইনের সহযোগিতা ছাড়া লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
উপসংহার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন সঙ্কট ও সুযোগের যুগে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বাস্তবায়ন সফল হলে, দেশটি টেকসই উৎপাদন, নৈতিক রপ্তানি এবং মানবাধিকার রক্ষায় একটি বিশ্বমানের উদাহরণ হয়ে উঠবে। তবে শ্রমিক, কারখানা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
পাঠকের মন্তব্য