![]()
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা— বহেড়াতৈল ইউনিয়নের বর্ষীয়ান নেতারা ও সাধারণ জনগণ এক সন্ধ্যায় জমায়েত হয় মঞ্চপাশে দাঁড়িয়ে শুনতে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সেই দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে প্রতিপাদ্য করেন ‘জনগণের ভোটাধিকার’ ও ‘জাতীয় ঐক্যের’ ওপর প্রবল জোর। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, রাজনৈতিক যোগ্যতা, এবং ভবিষ্যত নির্বাচনের নিয়ম-শর্ত নিয়ে তার বক্তব্যে ছিল সরাসরি অভিমুখী সমালোচনা ও স্পষ্ট অবস্থান।
“আমাদের আছে ৩ শতাংশ ভোট। যদি আওয়ামী লীগ–জাপা–বামপন্থী জোটকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়, যদি আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে না পারে, আমি গামছা নিয়ে ভোটে যাব না”— কাদের সিদ্দিকীর এই বক্তব্য একটি শক্ত রাজনৈতিক শর্ত ঘোষণা করল। এটা কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি নয়; এই কথা থেকে উঠে আসে এক গভীর মানবিক কণ্ঠ — যে কণ্ঠ চায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক, যে কণ্ঠ রাজনীতিকে মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার সঙ্গে জোড়া দেখতে চায়।
সরাসরি সমালোচনা: ইউনূস, জামায়াত ও বিএনপি
কাদের সিদ্দিকী বক্তব্যে কেন্দ্রবিন্দুতে আনেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও ‘গ্রামীণ’ মর্যাদা নিয়ে যে নির্মাণ হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে। “এনজিও চালানো আর দেশ চালানো এক কথা নয়”— কাদের সিদ্দিকীর কণ্ঠে ছিল সতর্কবার্তা; তিনি চান, দেশের স্বার্থে সবাইকে নিয়ে নির্বাচন ঘটুক।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তিনি তীব্র নিন্দা করেন— ইতিহাসের এমন কড়া সমালোচনা করেছেন যে, যুদ্ধকালীন অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ক্ষমা দাবি করে মানুষের সামনে বিনয়ের দরকার 있다는 কথা তিনি পুনরাবৃত্তি করেন। জামায়াতকে তিনি ‘লাফালাফি’কারী বলেও আখ্যায়িত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় যে অবস্থান নিয়েছিল তার দায় কিংবা ক্ষমা প্রসঙ্গে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন।
বিএনপির প্রতি সমালোচনা অনুপস্থিত নয়; কাদের সিদ্দিকী বলেন— বর্তমান বিভিন্ন সময়ে অপব্যবহার, অতিরক্তি, আর চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ক্ষমতার অপব্যবহারও হয়েছে। তার বক্তব্যে ছিল বর্তমান রাজনৈতিক তদন্ত ও বিচারের দাবি— যে হিসেব না হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না।
মানবিক প্রেক্ষাপট: কেন এ ব্যাপারটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়
কাদের সিদ্দিকীর ঢেউ কেবল রাজনীতিরই কথা বলে না— এতে রয়েছে গ্রামের মানুষের জীবন, স্বাধীনতার স্মৃতি, ও আগামী প্রজন্মের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ। তিনি বললেন, “আমি বঙ্গবন্ধু করি, আমি মুক্তিযুদ্ধ করি, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই”— এ কথাগুলো কেবল জাতীয় ভাবাবেগ প্রকাশ করে না; তারা মানুষের মর্যাদা ও ইতিহাসের সংরক্ষণে গভীর মানবিক আবেগ বহন করে।
স্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের কথায় ফুটে ওঠে— রাজনীতি যখন মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন তার বাস্তব ক্ষতি ঘটে: কৃষকের বাজার সংকুচিত হয়, শ্রমিকদের কাজ হয় না, পরিবারে অনিশ্চয়তা বাড়ে। কাদের সিদ্দিকীর জোরালো আহ্বান তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে সামাজিক সংহতি ও ন্যায়বিচারের দাবি করছে।
রাজনৈতিক ফলপ্রভাব: সম্ভাব্য টেকনিগত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থবৎ
কাদের সিদ্দিকীর এই বক্তব্য দুটি দিকেই ইঙ্গিত করে— প্রথমত, নিজ বস্তুগত অবস্থান স্পষ্ট করা (কোন পাত্রে ভোট দেওয়া হবে, কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আপত্তি তোলা হবে) এবং দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়বোধের পক্ষে থাকা। যদি জাতীয় পর্যায়ে এমন উচ্চস্বরে দাবি করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী মঞ্চে জোট, স্বার্থ ও মান-নীতির পুনর্বিবেচনা ঘটতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সিদ্ধান্তগুলি শুধুমাত্র বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না— বাস্তবায়নের জন্য দরকার কৌশল, দলগত ঐক্য ও সাধারণ জনগণের সমর্থন। কাদের সিদ্দিকীর আহ্বান যদি ব্যাপক সমর্থন পায়, তবে সেটি একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে; না হলে এটি কেবল ব্যক্তিগত নীতিগত সংকেত হিসেবেই রয়ে যাবে।
শেষ কথা: গণতন্ত্র, ইতিহাস ও মানুষের আশা
একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রোফাইল ধারণকারী কাদের সিদ্দিকীর ভাষণ— যেখানে আছে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান, তীক্ষ্ণ সমালোচনা, এবং মানবিক আহ্বান— সেটি মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চায় ইতিহাস ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গুরুত্ব কতটা। তার বার্তা স্পষ্ট: রাজনীতি যদি জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে, তাহলে অংশগ্রহণদারী গোষ্ঠীরাই তার বৈধতা প্রশ্ন করবে।
এই রকম কথাবার্তাগুলো কেবল রাজনৈতিক আঘাত নয়; এগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত আশা, আস্থা ও ঐতিহাসিক মর্যাদার প্রতিফলন। কাদের সিদ্দিকীর মঞ্চের বক্তব্য তাই রাজনীতির এক ধাঁচা বদলে দিতে পারে— যদি তা সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রয়োজন আর দেশের ঐতিহাসিক ন্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দ্রুত কর্মসূচিতে রূপ নেয়।
পাঠকের মন্তব্য