![]()
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তত ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা না থাকলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিত “নভেম্বর থেকে জুলাই : বিপ্লব থেকে বিপ্লবে” শীর্ষক এই আলোচনা সভায় তিনি বলেন—
“আমরা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা বলি, কিন্তু সংসদের ৩০০ জন সদস্যের মধ্যে কয়জনের কাছে ২০ কোটি টাকা নেই— সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। এখন এমন অবস্থা যে, অর্থ ছাড়া কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে না।”
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিপুল অর্থবলই প্রার্থী নির্বাচনের মূল নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সাধারণ ও সৎ মানুষদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অংশ নেওয়ার সুযোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অর্থের রাজনীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে জনগণের কণ্ঠ
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন,
“যারা অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, তারা নির্বাচিত হওয়ার পর সেই টাকার মালিকের স্বার্থই রক্ষা করেন। ব্যবসায়ী বা ধনীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে রাজনীতিতে গেলে জনগণের সেবা নয়, বরং পৃষ্ঠপোষকের সেবা দিতে হয়।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন— “মানুষ কি এখন টাকা ছাড়া ভোট দেয়? বর্তমান কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত, সেটাও ভাবার বিষয়।”
তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করছে। “নির্বাচন এখন কেবল অর্থশক্তির প্রতিযোগিতা, জনআস্থার নয়”— এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
ফরহাদ মজহারের বক্তব্য : “গণঅভ্যুত্থান ছাড়া গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়”
সভায় কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন,
“সংবিধান অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো বৈধতা নেই। জনগণের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই প্রকৃত গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব। রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামো জনগণের ভোট ও অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করে এক ধরনের প্রশাসনিক কৌশলে পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি মনে করেন, অর্থনির্ভর রাজনীতি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয় না, বরং তা অল্প কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
“জনগণের প্রতিনিধিত্ব নয়, অর্থের প্রতিনিধিত্ব”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থের প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে আলোচনা বেড়েছে, সেটি এবার নতুনভাবে সামনে আনলেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে— রাজনীতি এখন একটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে জনগণের প্রতিনিধি নয়, বরং টাকার মালিকরাই নির্ধারণ করেন কারা প্রার্থী হবেন।
এমন বাস্তবতায় দেশের তরুণ প্রজন্ম, মধ্যবিত্ত ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব রাজনীতির মূলধারায় স্থান পাচ্ছে না। গণতন্ত্রের পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
জোহরান মামদানি উদাহরণ : “একজন ব্যতিক্রম দিয়ে ৩০০ জন তৈরি হয় না”
আলোচনায় উঠে আসে নিউইয়র্কের অ্যাসেম্বলি সদস্য জোহরান মামদানির উদাহরণও। আসিফ মাহমুদ বলেন,
“অনেকে জোহরান মামদানির উদাহরণ দেন— যে তিনি সাধারণ মানুষের তহবিল ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশের কাঠামোর মধ্যে এমন ব্যতিক্রমী উদাহরণ ৩০০ আসনে ঘটানো সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের জন্য শুধু ইচ্ছা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন।
মানবিক প্রশ্ন : “যদি টাকা না থাকে, তাহলে কি নাগরিকের ভোটাধিকারও হারায়?”
এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে— গরিব মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেও, প্রার্থী হওয়ার অধিকার কি বাস্তবে নেই?
যখন রাজনীতি কেবল অর্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন মানবিক মূল্যবোধ, আদর্শ, ও জনগণের আস্থা হারিয়ে যায়। গণতন্ত্র তখন থাকে কেবল নামমাত্র।
পাঠকের মন্তব্য