বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক আজও কারাগারে।
তাঁর গ্রেপ্তার ও চলমান কারাবাস শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়—এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ওপর এক গভীর ছায়া ফেলে দিয়েছে।
অনেকে বলছেন, এটি হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি কালো অধ্যায়, যা আবারও প্রমাণ করছে—বিচার ও রাজনীতি এখনো পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়।
???? আওয়ামী লীগ আমলের পুনরাবৃত্তি
বর্তমান সরকারের অধীনে খায়রুল হকের গ্রেপ্তার অনেকের কাছে আওয়ামী লীগ আমলের দমননীতির প্রতিধ্বনি মনে হচ্ছে।
তখনও যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল, আজও অনেকে সেই ধারা ফিরে আসতে দেখছেন।
যাঁরা একসময় এই ধরনের দমন-পীড়নের তীব্র সমালোচক ছিলেন, আজ তাঁদের অনেকে নিজেরাই সেই একই অন্যায়ের সহযোগী বা নীরব দর্শক হয়ে গেছেন।
যে ব্যবস্থাকে তাঁরা একসময় “দুর্নীতিগ্রস্ত” বলেছিলেন, আজ সেটিই তাঁদের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
???? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: বিচার বিভাগের ওপর চাপ
২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা একটি সাংবিধানিক মামলায় সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন বলে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
সেই সময়ও গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাঁকে ও তাঁর সহযোগীদের ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করেছিল—এমন অভিযোগ আজও বিচার ইতিহাসে একটি কলঙ্কচিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমান সরকার যদিও সেই পর্যায়ে যায়নি, তবে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে অস্পষ্ট অভিযোগে কারাগারে পাঠানো নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক।
এমনকি আওয়ামী লীগও তাদের কঠোরতম সময়েও এমনটা করেনি।
???? অভিযোগ ও মামলার জটিলতা
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই তাঁর গ্রেপ্তার হয়।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে এক হত্যা মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়, যেখানে মোট আসামি ৪৮৭ জন।
এফআইআরে তাঁর নাম থাকলেও, তাঁর সঙ্গে ঘটনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র দেখানো হয়নি।
২৫ জুলাই আদালতে মামলার শুনানিতে বাদীপক্ষের একজন আইনজীবী প্রকাশ্যে বলেন,
“শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানানোর মূল কারিগর ছিলেন খায়রুল হক।”
এই মন্তব্য আইনি নয়, নিছক রাজনৈতিক। কোনো প্রমাণ ছাড়াই এমন বক্তব্য বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দেয়।
???? ন্যায়বিচারের পথে বাধা ও ভয়ভীতি
খায়রুল হকের জামিন বারবার নামঞ্জুর করা হয়েছে, এমনকি তাঁর আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যা অনেকের মতে, একটি ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার কৌশল।
এদিকে, আইনজীবী কল্লোল কিবরিয়া যখন এক নিবন্ধে এই গ্রেপ্তারের সমালোচনা করেন, পরদিনই তাঁকে ঢাকায় মারধর করা হয়।
এ ঘটনা দেখায়—বিচারিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও এখন ঝুঁকির মুখে।
???? ‘প্রতারণা’ মামলা: আইনের অপব্যবহার
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলাটি করা হয় তাঁর প্রধান বিচারপতি থাকাকালে দেওয়া ২০১১ সালের রায়ের ওপর ভিত্তি করে—যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণের মধ্যে ‘অমিল’ দেখিয়ে তাঁকে **‘জালিয়াতি’ ও ‘প্রতারণা’**র অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অযৌক্তিক ও হাস্যকর অভিযোগ, কারণ কোনো বিচারককে তাঁর রায়ের জন্য ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা যায় না।
অভিযোগের পেছনে আইনি যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই এখানে স্পষ্টতর।
???? দুদকের মামলা ও আটক প্রলম্বন
তৃতীয় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—যেখানে অভিযোগ ছিল পূর্বাচলে একটি প্লট বরাদ্দ ও সুদ পরিশোধ না করা নিয়ে।
অভিযোগের পরিমাণ ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা—যা সিভিল আদালতে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়, দুদকের ফৌজদারি মামলা নয়।
তবু এই মামলার মাধ্যমেই তাঁর আটককাল আরও দীর্ঘায়িত করা হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, লক্ষ্য হচ্ছে বিচার নয়, বন্দিত্ব বজায় রাখা।
???? রাজনৈতিক প্রতিশোধের পুনরাবৃত্তি
খায়রুল হকের প্রতি আচরণ আজকের বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাঁরা অতীতে এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন, আজ তাঁরা নীরব।
ফলে ক্ষমতার পালাবদলেও অবিচারের কাঠামো অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে।
???? জুলাই সনদ ও বাস্তবতা
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি বলেছেন,
“জুলাই সনদের মাধ্যমে বাংলাদেশ বর্বরতা থেকে সভ্যতার পথে এসেছে।”
কিন্তু সেই সনদের আহ্বান যখন চলছে, ঠিক তখনই সাবেক প্রধান বিচারপতি কারাগারে, এবং তাঁর আইনজীবীরা হামলার শিকার হচ্ছেন।
এ দৃশ্য এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে—যা সনদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
???? উপসংহার: আইনের শাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশ
খায়রুল হকের আটক কেবল একজন ব্যক্তির বা একটি সরকারের বিষয় নয়—
এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকেত।
যদি বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে,
তবে “বর্বরতা থেকে সভ্যতার পথে” যাত্রার সেই স্বপ্ন অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে।
পাঠকের মন্তব্য