![]()
ইবি রিপোর্ট
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আড়াল করতে পরিসংখ্যান বিকৃত করা হয়েছিল। তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় তিনটি বড় সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিতুমীর। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান—টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’।
অতীতের তথ্য বিকৃতির উদাহরণ তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, তৎকালীন সরকারের সময়ে পরিসংখ্যানকে মিথ্যাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ না করে বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নৌ শুমারির তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, আগের সরকারের সময়ে দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যা দেখানো হয়েছিল মাত্র ১৩ হাজার। অথচ পরবর্তী অনুসন্ধানে এ ধরনের নৌকার প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৭ হাজার।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বিতরণেও অতীতে অনিয়মের অভিযোগ করেন তিতুমীর। তিনি বলেন, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অনেকেই সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিপরীতে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যক্তি এসব সুবিধা পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায়ও সঠিক তথ্যের অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকায় এমন অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছিল।
তিতুমীর জানান, জাতীয় তথ্যব্যবস্থায় প্রথম সংস্কারের লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ। এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। ভৌগোলিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহকারীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করছেন কি না, তা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় যাচাই করা হবে। পাশাপাশি সংগৃহীত তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক তথ্যকেন্দ্র ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে।
দ্বিতীয় সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানভিত্তিক জননীতি তৈরি এবং সরকারি সেবার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত অসচ্ছল ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া প্রায় ৮০ লাখ মানুষের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অসচ্ছল নারী ও পরিবারগুলোর কাছে ফ্যামিলি কার্ডের সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তৃতীয় সংস্কারের আওতায় গড়ে তোলা হবে ডিজিটাল জনকাঠামো। এ জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনসংখ্যা নিবন্ধনের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং টেলিযোগাযোগ খাতের তথ্যভান্ডার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিতুমীর বলেন, তথ্য জালিয়াতি এবং অপতথ্যনির্ভর হাইব্রিড যুদ্ধ মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং জনগণের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্ভুল তথ্যের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভাটির আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
পাঠকের মন্তব্য