![]()
ইবি রিপোর্ট
শখের বশে ছাদে নানা জাতের গাছ সংগ্রহ করেছিলেন ইয়াসমিন খান। ব্যতিক্রমী গাছের প্রতি সেই ভালো লাগাই একসময় তাঁকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখন ‘রাঙ্গুলি’ নামের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকার গাছ বিক্রি করছেন তিনি। এ উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্বামী কে এম মঈনউদ্দীন। ছাদ ভাড়া নিয়ে গাছের চারা উৎপাদন, পরিচর্যা ও অনলাইনে বিক্রির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের শখকে ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন তাঁরা।
রাঙ্গুলি শব্দের অর্থ রঙের বাহার। নামের সঙ্গে মিল রেখে এই উদ্যোগে রয়েছে নানা রঙের ফুল ও পাতার গাছ। বিশেষ করে সাকুলেন্ট, ক্যাকটাস এবং ঘর, বারান্দা কিংবা ঝুলন্ত টবে সাজানোর উপযোগী গাছের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহকে কাজে লাগিয়েছেন এই দম্পতি।
করোনাকালে রাজধানীর রামপুরায় নিজেদের বাসার ছাদে গাছের সংগ্রহ গড়ে তোলেন ইয়াসমিন ও মঈনউদ্দীন। সময়ের সঙ্গে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকলে জায়গার সংকট দেখা দেয়। অন্যদের সঙ্গে ছাদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা তৈরি হয়। পরে তাঁরা পাশের একটি ভবনের ছাদ মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় নেন।
বর্তমানে সেই ছাদেই চলে গাছের চারা তৈরি, পরিচর্যা, অনলাইনে বিক্রির জন্য ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং ক্রেতাদের কাছে গাছ পাঠানোর প্রস্তুতি। কাজের সুবিধার জন্য দুজন কর্মীও রেখেছেন তাঁরা।
ইয়াসমিন খান বলেন, ‘শখটা একসময় নেশায় রূপ নেয়। অবশেষে নেশাটাকেই পেশায় পরিণত করি।’
রাঙ্গুলির ব্যবসার অন্যতম কৌশল হলো গাছের ডাল বা শাখা কেটে নতুন চারা উৎপাদন। অনেক গাছের ডাল ছোট ছোট অংশে কেটে টবে লাগালে উপযুক্ত পরিচর্যায় সেখান থেকে নতুন গাছ জন্মায়। এতে একটি গাছ থেকেই একাধিক চারা তৈরি করা সম্ভব হয়।
এ পদ্ধতির উদাহরণ হিসেবে ইয়াসমিন ‘রুবি নেকলেস’ গাছের কথা বলেন। ঝুলন্ত টবে গাছটি দেখতে আকর্ষণীয় লাগে এবং রোদ পেলে এতে বেগুনি আভা দেখা যায়। গাছটির আকার ও ঝোপালো হওয়ার ওপর নির্ভর করে টবসহ দাম পড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
তাঁর সংগ্রহের কিছু সাকুলেন্টের পাতা থেকেও নতুন চারা তৈরি করা যায়। উপযুক্ত কাটিং থেকে জন্মানো চারা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হতে পারে। তবে উৎপাদনের পরিমাণ নির্ভর করে গাছের জাত, বৃদ্ধির গতি ও পরিচর্যার ওপর।
রাঙ্গুলিতে পার্পল ডিলাইট, মুরাসাকি, হাকুহো, ক্রাসুলা, অরুণ পেই, রোজ, মাউন্টেন রোজ, অ্যানোনিয়াম ও জেড প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন জাতের সাকুলেন্ট পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে তাঁদের সংগ্রহে সাকুলেন্টের প্রায় ৩০০ ধরনের জাত রয়েছে।
গাছের ধরন, আকার ও পরিপক্বতা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। ছোট সাকুলেন্টের দাম সাধারণত ১০০ টাকা থেকে শুরু। বড় ও বিরল জাতের সাকুলেন্টের দাম ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ক্যাকটাসের দাম শুরু হয় ১৫০ টাকা থেকে। জাত ও আকারভেদে কিছু ক্যাকটাসের দাম পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা।
রাঙ্গুলির বিক্রির প্রধান মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক পেজে গাছের ছবি ও ভিডিও দেখে ক্রেতারা অর্ডার দেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গাছ পৌঁছে দিতে তাৎক্ষণিক পার্সেল সরবরাহসেবার সহায়তা নেওয়া হয়।
পরিবহনের সময় গাছ যাতে ভেঙে না যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য কার্টনে ভরে প্যাকেট করা হয়। ঢাকার বাইরেও কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় গাছ পাঠান তাঁরা। চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে তুলনামূলক বেশি অর্ডার আসে। দূরের জেলায় পাঠানোর ক্ষেত্রে গাছের ক্ষতি এড়াতে অনেক সময় টব থেকে গাছ আলাদা করে প্যাকেট করা হয়। পাশাপাশি বছরে দু-একবার বিভিন্ন বৃক্ষমেলায়ও অংশ নেন তাঁরা। সম্প্রতি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের রাজধানী উচ্চবিদ্যালয়ে আয়োজিত বৃক্ষমেলায় স্টল দিয়েছিল রাঙ্গুলি।
সাকুলেন্ট ও ক্যাকটাসের পাতায় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা থাকায় এগুলোতে ঘন ঘন পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ইয়াসমিনের মতে, কিছু জাতের গাছ ১০ থেকে ১৫ দিন পানি না দিলেও টিকে থাকতে পারে। তবে জাত, মাটির মিশ্রণ, আলো ও আবহাওয়া অনুযায়ী পরিচর্যার ধরন বদলাতে হয়।
গাছের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে তাঁরা সাধারণ মাটির বদলে বালি, ভার্মি কম্পোস্ট, ধানের তুষ ও ইটের কুচি মিশিয়ে বিশেষ মাধ্যম ব্যবহার করেন। গাছের বৃদ্ধি ও শিকড়ের অবস্থা বিবেচনায় এক থেকে দুই বছর পর টব ও মাটির মিশ্রণ পরিবর্তন করেন।
বহুজাতিক একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কে এম মঈনউদ্দীনও এই উদ্যোগকে বিকল্প পেশা হিসেবে দেখছেন। চাকরিতে কখনো সমস্যা হলে তিনি গাছের ব্যবসায় পূর্ণকালীন সময় দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
পাঠকের মন্তব্য