
ইবি রিপোর্ট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায় প্রকাশের পর ঘোষিত সাজা অপর্যাপ্ত বিবেচনায় তা বাড়ানোর জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রতিটি অভিযোগে তাকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ার কারণে মোট ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে তাকে। দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মামলায় সংঘটিত অপরাধের মাত্রা ও প্রমাণিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত সাজা পর্যাপ্ত নয় বলে তারা মনে করছে। এ কারণে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সাজা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে আপিল করা হবে।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহিংসতায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে মোট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রমাণিত হয়েছে এবং বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর ব্যবস্থা ও বলপ্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বৈঠকে দমনমূলক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ।
এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও মামলায় ছিল। তবে সব অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি। রায়ে নির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগে ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায় অনুযায়ী, তিন নম্বর অভিযোগে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ছবি ব্যবহার করে তালিকা তৈরি এবং তাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
ছয় নম্বর অভিযোগে তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইনুর সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে বলা হয়।
সাত নম্বর অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে। এসব তিন অভিযোগেই ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ছয় ও সাত নম্বর অভিযোগে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা, ১৯ জুলাইয়ের বৈঠকে কথিত ‘শুট অন সাইট’ নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার মতো অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হওয়ায় ইনুকে সেসব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।
তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলের নেতৃত্ব দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ৩০ জুন তারা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় ইনু ছিলেন একমাত্র আসামি। প্রসিকিউশন মোট ১০ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষ দুইজন সাক্ষী উপস্থাপন করে। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করেন।
এখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সাজা বাড়ানোর দাবিতে প্রসিকিউশনের আপিলের বিষয়টি সামনে এসেছে। আপিল হলে উচ্চ আদালতে বিষয়টি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে।
পাঠকের মন্তব্য