
ইবি রিপোর্ট
পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে পাবনার নাজিরগঞ্জ ও রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া নৌরুটে টানা ১১ দিন ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এই পথে চলাচলকারী যাত্রী, পরিবহন চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া ফেরি সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমএন আল শিবলী জানান, গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে এ নৌপথে যানবাহন পারাপার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না পেয়ে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ট্রলার ও স্পিডবোটে পদ্মা নদী পার হচ্ছেন। উত্তাল নদীতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নিয়ে এসব নৌযান চলাচল করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরি। অন্যদিকে কূল ঘেঁষে ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে উত্তাল পদ্মা পার হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও আশপাশের জেলার পরিবহন চালকেরা সময় ও খরচ বাঁচাতে নিয়মিত এই নৌপথ ব্যবহার করেন। নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া নৌরুট ব্যবহার করলে স্বাভাবিক সড়কপথের তুলনায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যায়।
২০২৩ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কাছ থেকে নৌরুটটি অধিগ্রহণ করে বিআইডব্লিউটিসি। এরপর ‘কপোতি’ ও ‘ক্যামেলিয়া’ নামে দুটি ফেরি দিয়ে দিনে চারবার যানবাহন পারাপার শুরু হয়।
তবে বর্তমানে দুটি ফেরির একটিও স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছে না। ‘কপোতি’ প্রায় তিন মাস ধরে বিকল হয়ে আছে। অন্যদিকে ‘ক্যামেলিয়া’ পদ্মার তীব্র স্রোতের কারণে চলাচলের সক্ষমতা হারিয়েছে।
নাজিরগঞ্জ ঘাটের টারমিনাল সুপারিনটেনডেন্ট খাইরুল ইসলাম খোকন জানান, স্বাভাবিক সময়ে নদী পার হতে একটি ফেরির প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু স্রোত বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি পারাপারে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছিল।
এরপর ফেরির ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমে আসা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ৬ সেপ্টেম্বর থেকে কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় পরিবহনগুলোকে এখন বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। কেউ লালন শাহ সেতু ঘুরে যাচ্ছেন, আবার কেউ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট পার হয়ে আরিচা হয়ে পাবনার কাজিরহাটের দিকে যাচ্ছেন।
ফলে পরিবহন চালকদের বাড়তি সময়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত জ্বালানি খরচও বহন করতে হচ্ছে।
এ নৌপথের যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ-পাবনা-নাটোরসহ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের এই সহজ পথটির বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে উদাসীনতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রুটটিতে মানসম্মত ও শক্তিশালী ফেরি না দেওয়ায় সামান্য প্রতিকূল আবহাওয়া বা নদীর স্রোত বাড়লেই পারাপার বন্ধ হয়ে যায়।
নিয়মিত যাতায়াতকারী কবীর হোসেন বলেন, শুরু থেকেই এই নৌপথে সরকারের অবহেলা দেখছেন তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, সরকার বিভিন্নভাবে এ নৌরুট থেকে রাজস্ব আদায় করলেও যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি জানান, সাধারণ সময়ে নাজিরগঞ্জ ঘাট থেকে ধাওয়াপাড়া ঘাটে একটি মোটরসাইকেল ও দুজন যাত্রীর ভাড়া ২৫০ টাকা। ফেরি বন্ধ থাকায় এখন মোটরসাইকেল পারাপার করা যাচ্ছে না।
ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে নদী পার হতে হলে মাথাপিছু ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে মোটরসাইকেলের জন্য আরও ১৫০ থেকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু যাত্রী ও পরিবহন চালকরাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঘাট এলাকার ব্যবসায়ীরাও। বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
নাজিরগঞ্জ ঘাটের মায়ের দোয়া হোটেলের মালিক আব্দুল আলীম বলেন, ঘাট সচল থাকলে তাঁদের বেচাকেনা ভালো হয়। ঘাট বন্ধ থাকলে তাঁদের ব্যবসাও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ঘাট এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের এই দুরবস্থা দেখার কেউ নেই বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
টারমিনাল সুপারিনটেনডেন্ট খাইরুল ইসলাম খোকন বলেন, নদীর পানির পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই ফেরি চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এ রুটে ভালো ফেরি দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত চাপ দেওয়া হচ্ছে।
ঘাট ইনচার্জ এমএন আল শিবলী জানান, নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বড় ফেরির প্রয়োজনীয়তা জানানো হলে বিআইডব্লিউটিসি ১৫ থেকে ১৮টি যানবাহন বহনে সক্ষম ‘কদম’ নামের একটি ইউটিলিটি ফেরি বরাদ্দ করেছিল। তবে মেরিন বিভাগের আপত্তির কারণে সেই বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, কে-টাইপ ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরিতে মাত্র ৭ থেকে ৮টি ট্রাক বহন করা যায়। তীব্র স্রোতের মধ্যে ফেরি চালানোর সময় ইঞ্জিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে বিকল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। নদীর স্রোত শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ নৌরুটে স্বাভাবিক ফেরি চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য