
ইবি রিপোর্ট
অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে ফেসবুক লাইভে কথা বলেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে ক্ষোভ মেটানো এবং তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষে তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হলেও ততদিনে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও জনমনে তার ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে ভবিষ্যতে তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হলেও সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। আর এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনমত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনীতি মূলত জনমতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান চলতে থাকলে এবং সেই অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে পড়লে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সেই আন্দোলনের নেতাদের নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে এই অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এনসিপির এই মুখপাত্র। তার দাবি, তিনি এমন কোনো কাজ করেননি, যা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কিংবা দেশের জনগণের প্রতি তার অঙ্গীকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, অভিযোগের তদন্তে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সময় লাগলে এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি হতে পারে। সেই ন্যারেটিভকে সামনে রেখে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার চেষ্টা হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করেন।
রাজনৈতিকভাবে তাকে এবং তার পরিবারকে হয়রানি করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। আসিফ মাহমুদ বলেন, তার বিরুদ্ধে তৈরি করা ন্যারেটিভ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক হয়রানি করা সম্ভব।
দুদকের অনুসন্ধান রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি জানান, সরকারের আশপাশে থাকা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন—এমন কয়েকজনের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তার ধারণা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে ক্ষোভ মেটাতেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের নেতা বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকার সময় তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তার দাবি, সেই অসন্তোষ ও প্রতিশোধের কারণেই তার বিরুদ্ধে পুরো প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে তার মনে হয়নি যে এই অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা। বরং বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রক্রিয়া হিসেবেই তিনি দেখছেন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আসিফ মাহমুদ। তার ভাষ্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা প্রমাণের চেয়ে সেগুলোকে সংবাদ কনটেন্ট হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা বেশি করা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, শুরু থেকেই তারা দেখছেন অভিযোগগুলোকে মানুষের কাছে বেশি করে ভোগ্য সংবাদ কনটেন্ট হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে আসিফ মাহমুদ বলেন, চার দেশে তার বিপুল অর্থ পাচারের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার এক টাকাও যদি দেশের বাইরে পাওয়া যায়, তাহলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।
তিনি বলেন, দেশের বাইরে তার কোনো বিনিয়োগ বা সম্পদ আছে—এমনকি এক টাকার সমপরিমাণ অর্থও যদি প্রমাণ করা যায়, তাহলে তিনি সেদিনই রাজনীতি থেকে সরে যাবেন। একই সঙ্গে দেশের বাইরে তার কেনা কোনো সম্পদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্যও তিনি সংশ্লিষ্টদের চ্যালেঞ্জ জানান।
নিজের জাতীয়তাবোধের কথা উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, তার মানসিকতা এমন যে, কেউ যদি তাকে ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করা অথবা দেশ ছেড়ে আরাম-আয়েশে জীবনযাপনের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলে, তাহলে তিনি কারাদণ্ডকেই বেছে নেবেন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি দাবি করেন, তার দুই ভগ্নিপতি নেই; তার বড় বোনই শুধু বিবাহিত এবং একজন ভগ্নিপতি রয়েছেন। আর তার যে ভাগ্নের কথা বলা হচ্ছে, তার বয়স আড়াই থেকে তিন বছর।
আসিফ মাহমুদ বলেন, মাত্র হাঁটতে শেখা একটি আড়াই থেকে তিন বছরের শিশুকেও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। বিষয়টিকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন।
বর্তমান সরকার ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই মুখপাত্র। তার দাবি, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার এখন সেই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে থাকা শক্তিগুলোর ন্যারেটিভ অনুসরণ করে তাদের ওপর দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে।
এ সময় জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। তার পরামর্শ, শুধু কোনো ক্লিকবেইট শিরোনাম দেখে যেন কেউ কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছান। বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শুনে এবং বিষয়টি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সরকার ও গণমাধ্যমের বক্তব্যও সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করার আহ্বান জানান আসিফ মাহমুদ। তার মতে, সরকারের হাতে ক্ষমতা রয়েছে বলেই তাদের বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। একইভাবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনও সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তার বক্তব্য মূলত এসব অভিযোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া নিয়ে তার অবস্থান ও আশঙ্কা তুলে ধরে।
পাঠকের মন্তব্য