
ইবি রিপোর্ট
জমি কিনেছেন বা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হয়েছেন? ভাবছেন দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়ে গেছে মানেই আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ? মোটেও না। আপনি যদি সময়মতো নামজারি বা মিউটেশন না করান, তবে যেকোনো সময় সেই জমি নিয়ে ভয়াবহ ঝামেলায় পড়তে পারেন।
সম্প্রতি নামজারি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নতুন ও বড় একটি পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। আপনি কি জানেন—এখন থেকে বাবার জমি এক ভাই বা বোন চাইলেও আর নিজের নামে আলাদা খতিয়ান বানিয়ে নিতে পারবেন না? আজ একদম সহজ ভাষায় জানব নামজারির নতুন নিয়মগুলো এবং এর সুবিধা ও অসুবিধা।
নামজারি কী এবং কেন বাধ্যতামূলক?
জমি কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ান থেকে আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিক হিসেবে আপনার নাম নথিভুক্ত করাকেই বলে নামজারি বা মিউটেশন।
মনে রাখবেন, রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিল করলেই কাজ শেষ হয় না। নামজারি না করলে ভূমি অফিসে আপনার নাম থাকবে না। ফলে যেকোনো অসৎ ব্যক্তি বা ওয়ারিশ সেই জমি নিজের দাবি করে দখল বা বিক্রি করে দিতে পারে। তাছাড়া নতুন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে—নামজারির খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি বিক্রি, দান বা হেবা করা অসম্ভব। এমনকি বার্ষিক খাজনা দিতে গেলেও আপনার নিজের নামে নামজারি খতিয়ান লাগবে।
উত্তরাধিকার জমির নতুন নিয়ম
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নামজারির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে। এতদিন নিয়ম ছিল—বাবা মারা গেলে কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে যেকোনো একজন অন্যদের না জানিয়ে নিজের অংশের জমি আলাদা নামজারি করে নিতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে সেটি পুরোপুরি বন্ধ।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে সব ওয়ারিশের নাম একসাথে একই খতিয়ানে যৌথ মালিক হিসেবে নামজারি করতে হবে। আবেদনের সময় মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের তথ্য, ইউপি চেয়ারম্যান/পৌর মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একসাথে জমা দিতে হবে। কোনো একজন ওয়ারিশের তথ্য বাদ পড়লে পুরো আবেদনটিই নামঞ্জুর হতে পারে।
আলাদা খতিয়ান পাওয়া যাবে কীভাবে?
আপনি যদি একা নিজের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান বা আলাদাভাবে খাজনা দিতে চান, তবে আপনাদের নিজেদের মধ্যে একটি নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে। অর্থাৎ নতুন নীতির মূল কথা হলো—আগে যৌথ, পরে আলাদা। যৌথ নামজারির জন্য রেজিস্টার্ড বণ্টননামা লাগবে না, শুধু ওয়ারিশ সনদই যথেষ্ট। তবে পৃথক খতিয়ান করতে গেলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা লাগবেই।
নতুন নিয়মের সুবিধা ও অসুবিধা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিয়মে তিনটি বিরাট সুফল পাওয়া যাবে:
প্রতারণা বন্ধ: বোনদের বা বিদেশে থাকা ভাইদের না জানিয়ে একা সব জমি নিজের নামে নামজারি করার যে প্রবণতা ছিল, তা শতভাগ বন্ধ হবে। বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষা পাবে।
মামলা-মোকদ্দমা হ্রাস: যৌথ খতিয়ানে সবার নাম থাকার কারণে ভুয়া বিক্রি ও জমি দখল কমবে, ফলে আদালতে বছরের পর বছর চলা জমি সংক্রান্ত মামলা অনেকটাই কমে আসবে।
নামজারি আবেদন বাতিল বন্ধ: আগে অনেক ভূমি অফিস বণ্টননামা না থাকলে যৌথ নামজারিও বাতিল করে দিত। এখন স্পষ্ট করা হয়েছে—বণ্টননামা না থাকলেও যৌথ নামজারি কোনোভাবেই বাতিল করা যাবে না।
তবে এতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন পরিবারের কোনো সদস্য বিদেশে থাকলে বা যোগাযোগ না থাকলে সবার কাগজপত্র একসাথে করা কঠিন হতে পারে। আর আলাদা খতিয়ান করতে গেলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামায় বাড়তি কিছু খরচ ও সময় লাগবে।
জরুরি কিছু পরামর্শ
বর্তমানে ভূমিসেবা পোর্টালে অনলাইনেই নামজারির আবেদন করা যায়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া শেষ হয়। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিচ্ছেন:
নতুন জমি কেনার পর দলিল হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নামজারির আবেদন করে ফেলতে হবে।
জমি যদি বহু আগে নামজারি করা থাকে, তবে নতুন করে নামজারি করতে হবে না। তবে নামজারির তথ্যটি অনলাইনে ডিজিটাইজড হয়েছে কি না, তা ভূমিসেবা পোর্টালে যাচাই করে নিন। ডিজিটাল রেকর্ডে না থাকলে ভবিষ্যতে খাজনা দিতে বা জমি বিক্রি করতে সমস্যা হতে পারে।