
ইবি রিপোর্ট
একনেকের অনুমোদনের জন্য সব প্রস্তুতিই প্রায় শেষ হয়েছিল। প্রকল্পের সারসংক্ষেপ তৈরি, অপেক্ষমাণ তালিকায়ও ছিল ওপরের দিকে। পিইসি সভার সুপারিশ অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনও করা হয়েছিল। কিন্তু একনেকে ওঠার ঠিক আগে আবারও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফলে ৪ হাজার ৬৬১ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রকল্পটি একনেকের বৈঠকে উপস্থাপন না করে ফেরত পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। ব্যয় কমিয়ে নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং এবং হপার ড্রেজার ক্রয়’ প্রকল্পে এমন ঘটনা ঘটেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের ব্যয়ের কয়েকটি খাত নিয়ে। এর মধ্যে শুধু সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগেই ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। দুটি হপার ড্রেজার নির্মাণ তদারকিতে ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি নিয়োগের জন্য আরও ১০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ২৪ মাস রাবনাবাদ চ্যানেলে ড্রেজিং করতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর দুটি হপার ড্রেজার কিনতে প্রয়োজন হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই যাচ্ছে ড্রেজিং ও ড্রেজার কেনার পেছনে। এর বাইরে পরামর্শক ও তদারকি খাতের ব্যয়ও রয়েছে। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েই নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিইসির পরও কেন প্রশ্ন
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছিল। সভায় বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় কমানোর সুপারিশ দেওয়া হয়। পরে সেই সুপারিশ অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়। এরপর প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়।
কিন্তু পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির দপ্তরে সারসংক্ষেপ যাওয়ার পর প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে আবারও প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে কোন কোন খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব, তা আরও ভালোভাবে যাচাই করতে বলা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে একনেকের বৈঠকে না তুলে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, পিইসি পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পরও কেন একনেকে ওঠার আগ মুহূর্তে ব্যয় কমানোর প্রয়োজন দেখা দিল। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় নির্ধারণের পদ্ধতিও নতুন করে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
পরামর্শকেই ২৩ কোটি ৬৩ লাখ
প্রকল্পের ব্যয়ের অন্যতম আলোচিত খাত সুপারভিশন পরামর্শক। এ খাতে ২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুটি হপার ড্রেজার নির্মাণ তদারকির জন্য ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি নিয়োগে ১০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। একটি প্রকল্পে সরাসরি অবকাঠামো নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনার তুলনায় পরামর্শক ও তদারকি খাতে কতটা ব্যয় যুক্তিসংগত, সেটিই এখন পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্রেজিংয়েই ৩ হাজার কোটি
রাবনাবাদ চ্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। এ চ্যানেলের ২৪ মাসের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ১৩২ কোটি ২৪ লাখ টাকা ড্রেজিংয়ে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা হবে। এতে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের প্যানাম্যাক্স আকৃতির প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু ঠিকাদারনির্ভর ড্রেজিং নয়, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সে জন্য দুটি হপার ড্রেজার কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৪০০ কোটি টাকার দুটি ড্রেজার
প্রকল্পে দুটি হপার ড্রেজার কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। প্রতিটির ধারণক্ষমতা হবে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ঘনমিটার। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, নিজস্ব ড্রেজিং সক্ষমতা না থাকায় বর্তমানে রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখতে বাইরের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব ড্রেজার থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে এই নির্ভরতা কমবে। তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রস্তাবিত ব্যয়ে ড্রেজার দুটি কেনা এবং পরিচালনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কতটা। পাশাপাশি ড্রেজার কেনার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চ্যানেল ভরাটের আশঙ্কা
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং বন্ধ হলে রাবনাবাদ চ্যানেল ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাবে। এতে পায়রা বন্দরের নাব্যতা কমে যাবে এবং বড় জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। এর আগে চ্যানেলটিতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংও চলছে। তাই রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং বন্ধ হলে আগের বিনিয়োগের সুফলও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া পায়রা বন্দর ঘিরে চলমান ও প্রক্রিয়াধীন বিভিন্ন বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি ঋণে পুরো অর্থ
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সম্মতি দিয়েছিল অর্থ বিভাগ। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্তও দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত পুরো অর্থই শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয় খাত যৌক্তিক কি না, তা যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
অনুমোদন পিছোলে বাড়বে ঝুঁকি
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের বর্তমান সদস্য ও সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়, প্রকল্পটির সঙ্গে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের লক্ষ্যগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে। বিশেষ করে নৌপরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব ইতিবাচক দিক থাকলেও ব্যয়ের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, কোনো প্রকল্পের ব্যয় বেশি হলে পিইসি বা সেক্টর পর্যায়েই সেটি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। তিনি বলেন, একবার প্রকল্প ফেরত গেলে সংশোধন করে আবার আনতে সময় লাগে। এতে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বাস্তবায়নও পিছিয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে প্রকল্পের ব্যয়ও। এখন ব্যয় কমিয়ে সংশোধিত ডিপিপি কবে আসে, সেটিই দেখার বিষয়। পাশাপাশি নতুন করে পর্যালোচনায় প্রকল্পের কোন কোন খাতে ব্যয় কমানো হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ