
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশি রোগীদের মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ, নির্বিঘ্ন ও রোগীবান্ধব করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চিকিৎসার আগে রোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, চিকিৎসাকালীন সেবা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিল (এমএইচটিসি)।
একই সঙ্গে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের ভোগান্তি কমবে এবং চিকিৎসা পর্যটন খাতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছে এমএইচটিসির একটি প্রতিনিধিদল। এমএইচটিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দাতো সুরিয়াগান্ধী সুপ্পিয়াহর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া স্বাস্থ্যসেবা সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশ মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উপদেষ্টা এবং মালয়েশিয়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রেড রিলেশন্স অ্যাসোসিয়েশনের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান মাহবুব আলম শাহ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মনিকা, বাণিজ্য উইংয়ের প্রথম সচিব প্রণব কুমার ঘোষ এবং তৃতীয় সচিব (রাজনৈতিক) এস এম সায়েমও বৈঠকে অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশি রোগীরা মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব জটিলতা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হন, সেগুলো কমিয়ে পুরো ‘পেশেন্ট জার্নি’ বা চিকিৎসা-যাত্রাকে আরও নির্বিঘ্ন করার বিষয়টি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন রোগীর জন্য শুধু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। ভিসা ও ভ্রমণ প্রস্তুতি, হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা গ্রহণ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং দেশে ফেরার পর চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ—সব মিলিয়েই একজন রোগীর চিকিৎসা-যাত্রা সম্পন্ন হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে রোগী ও স্বজনদের বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই রোগীর চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগ থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার পর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করা, প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পরও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা-পরবর্তী পরামর্শ ও ফলোআপ সেবা চালু রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেলিমেডিসিনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে যাওয়া রোগীদের জন্য মালয়েশিয়ার চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। এতে অনেক ক্ষেত্রে ফলোআপের জন্য আবার বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে এবং রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারে।
চিকিৎসা পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতাল, এমএইচটিসি, রোগী সহায়তাকারী এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বৈঠকে উঠে আসে।
কারণ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাদাতা যুক্ত থাকে। এসব পক্ষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় থাকলে রোগীরা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পেতে পারেন এবং চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও কমে আসে।
এ ছাড়া দুই দেশের স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসা পর্যটনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় দেশই উপকৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর আগে বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা পর্যটন নিয়ে আলোচনা করেছিল এমএইচটিসি। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
দুই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের মধ্যে যোগাযোগ আরও গভীর করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়েও কাজ চলছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ আরও সহজ ও সংগঠিত হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশে আবারও ‘মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার উইক’ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এই আয়োজনকে সামনে রেখে বাংলাদেশি রোগী, স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং মালয়েশিয়ার বিভিন্ন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার উইক’ দুই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংশ্লিষ্টদের সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি রোগীরা মালয়েশিয়ার চিকিৎসাসেবা, হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধা সম্পর্কে আরও সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ হাইকমিশন ও এমএইচটিসির মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগের ফলে দুই দেশের চিকিৎসা পর্যটন সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে রোগীবান্ধব সেবা, টেলিমেডিসিন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের অভিজ্ঞতাও আরও ইতিবাচক হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দুই দেশের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।