
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের পর শূকরের একটি কিডনি টানা ২৭১ দিন সফলভাবে কাজ করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে ভিন্ন প্রজাতির অঙ্গ মানবদেহে প্রতিস্থাপন বা জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের মাস জেনারেল ব্রিগ্যাম হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, উপযুক্ত মানব কিডনি না পাওয়া পর্যন্ত শূকরের জিনগতভাবে পরিবর্তিত কিডনি রোগীদের জন্য সাময়িক ‘সেতু’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই পরীক্ষামূলক চিকিৎসার অংশ ছিলেন ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুস। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণে তাঁর কিডনি বিকল হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর শরীরে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিস্থাপনের পরপরই কিডনিটি কাজ শুরু করে এবং টানা ২৭১ দিন কার্যকর ছিল। পরে কিডনিটির কার্যক্ষমতা কমে গেলে সেটি শরীর থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর অ্যান্ড্রুসকে ৮২ দিন ডায়ালাইসিস নিতে হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কাছ থেকে স্থায়ীভাবে কিডনি পান। বর্তমানে সেই মানব কিডনিটি সফলভাবে কাজ করছে।
অ্যান্ড্রুসের জন্য এই পরীক্ষামূলক প্রতিস্থাপন ছিল দীর্ঘদিনের কষ্ট থেকে মুক্তির একটি সম্ভাবনা। কিডনি বিকল রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অ্যান্ড্রুস বলেন, তাঁর হাতে সময় খুব কম ছিল এবং পরিস্থিতি ক্রমেই হতাশাজনক হয়ে উঠছিল। শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনকে তিনি নিজের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখেছিলেন। ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কেন শূকরের কিডনি?
মানুষের অঙ্গের ঘাটতি মেটাতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই শূকরের অঙ্গ নিয়ে গবেষণা করছেন। মানুষের অঙ্গের সঙ্গে শূকরের অঙ্গের আকার ও গঠনে বেশ কিছু মিল রয়েছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শূকর পালন ও প্রজননের প্রযুক্তিও বিজ্ঞানীদের কাছে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য।
তবে সাধারণ শূকরের কিডনি সরাসরি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা যায় না। মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এটিকে বিদেশি ও ক্ষতিকর বস্তু হিসেবে শনাক্ত করে দ্রুত আক্রমণ করতে পারে। এতে প্রতিস্থাপিত অঙ্গ অল্প সময়ের মধ্যেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় গবেষকেরা ‘ইউকাতান মিনিএচার’ জাতের শূকরের জিনগত কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। গবেষণায় শূকরের অঙ্গে ৬৯টি জিনগত পরিবর্তন করা হয়। এর মাধ্যমে এমন কিছু উপাদান সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যেগুলো মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
একই সঙ্গে শূকরের জিনগত কাঠামোয় কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল শূকরের টিস্যুকে মানুষের ইমিউন সিস্টেমের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। পাশাপাশি শূকরের ডিএনএতে থাকা সম্ভাব্য ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে, যাতে মানবদেহে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
ছয় মাস পর দেখা দেয় জটিলতা
প্রতিস্থাপনের পর প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্ড্রুসের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কিডনিটি প্রত্যাখ্যান করার কিছু লক্ষণ দেখিয়েছিল। তবে চিকিৎসকেরা ওষুধ পরিবর্তন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। একই সঙ্গে অঙ্গটিতে প্রদাহ দেখা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে কিডনিটি ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারায়।
তবে চিকিৎসকেরা কিডনিটির বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির আক্রমণের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাননি। ফলে ঠিক কী কারণে অঙ্গটির কার্যক্ষমতা শেষ পর্যন্ত কমে গেল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
কিডনি সংকটে সম্ভাবনার নতুন দরজা
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু অপেক্ষমাণ রোগীর তুলনায় প্রতিবছর মানবদাতার কাছ থেকে পাওয়া কিডনির সংখ্যা অনেক কম। ফলে অনেক রোগীকেই দীর্ঘ সময় ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই বাস্তবতায় জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে যেসব রোগীর জীবিত মানবদাতা নেই এবং যাদের দীর্ঘদিন ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাস জেনারেল ব্রিগ্যামের ট্রান্সপ্লান্টেশন বিজ্ঞান কেন্দ্রের ড. লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, প্রতিস্থাপনের উপযোগী অঙ্গের ঘাটতির কারণে বিশ্বজুড়ে একটি বড় সংকট চলছে। তাঁর মতে, জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন এমন রোগীদের জন্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, যাদের জীবিত মানবদাতা নেই।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ঘটনা মানবদেহে শূকরের কিডনি ব্যবহারের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে এই প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, রক্তনালির ক্ষতি এবং অঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, মানুষের জন্য উপযুক্ত কিডনি না পাওয়া পর্যন্ত যদি জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি নিরাপদে কাজ করানো সম্ভব হয়, তাহলে এটি কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অ্যান্ড্রুসের ২৭১ দিনের অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনার পথকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য