
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সর্বশেষ জলবায়ু পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সঙ্গে চলমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় এবার এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনো ‘চোখের সামনেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে’। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যার নজির আগে দেখা যায়নি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর কেন্দ্রস্থলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। তবে এটি এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ১৪টি ভিন্ন জলবায়ু মডেলের গড় পূর্বাভাস বলছে, আগামী নভেম্বরে এল নিনোর তীব্রতা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
সাধারণত সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে সেটিকে এল নিনো পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের সম্ভাব্য মাত্রা সেই তুলনায় অত্যন্ত বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
যেভাবে প্রভাব ফেলছে এল নিনো
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা। এ সময় সমুদ্রের উষ্ণ পানি ও বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ভারতে দুর্বল হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত। সামনে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হওয়ায় চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠছে। ফলে এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাবও এবার অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু বিশ্লেষক জিক হাউসফাদারের মতে, প্রবাল, গাছের বার্ষিক বলয় এবং ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক হাজার বছরে কোনো এল নিনো এবারের মতো শক্তিশালী হয়নি।
খাদ্যসংকটে পড়তে পারে কোটি মানুষ
এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে খাদ্য উৎপাদনে। খরা, অতিবৃষ্টি ও চরম তাপমাত্রার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যের সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং দাম বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, এল নিনোর কারণে আগামী বছর প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। শুধু আমদানিনির্ভর খাদ্য নয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যও চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৭ সালে ভাঙতে পারে তাপমাত্রার রেকর্ড
এবারের এল নিনোর আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বৈশ্বিক তাপমাত্রার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগে থেকেই বাড়ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এর প্রভাবে ২০২৭ সাল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা, খরা ও চরম তাপমাত্রার মতো আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের প্রভাব আগামী বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
জুলাই ও আগস্টের শুরুর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি এলাকায় সমুদ্রের তলদেশের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি ছিল। এটি এল নিনোর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘সময় নেই’, সতর্ক ডব্লিউএমও
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। এরই মধ্যে খরা ও বন্যার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তিনি জানান, জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।
জাতিসংঘের এল নিনো পূর্বাভাস বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের মডেল থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়।
জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এল নিনোর শক্তিশালী প্রভাব বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল এবং আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাজ্যের এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ক্রিস জাকারিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার কারণে খাদ্যের দাম ইতোমধ্যে বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে দরিদ্র মানুষের ওপর।
তার মতে, দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ও শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি জলবায়ু সংকটের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতিসংঘের বার্তা তাই স্পষ্ট—এল নিনোর সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতির সময় এখনই। আগাম সতর্কতা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য