
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া অনলাইন ব্যবসা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য পৃথক ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার। এর মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করার পাশাপাশি নিবন্ধিত মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার (৩১ আগস্ট) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শেরপুর-১ আসনের বিরোধীদলীয় (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য এম রাশেদুল ইসলাম রাশেদের কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, ই-কমার্স ব্যবসা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে নিবন্ধিত এমএলএম কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম কঠোর নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।
দ্রুত বেড়েছে অনলাইন ব্যবসা
কোভিড-১৯ মহামারির আগে ও পরে দেশে অনলাইন ব্যবসার পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ ঘরে বসে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায় increasingly অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠলেও একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, অনলাইন ব্যবসা ও এমএলএম কোম্পানিগুলোকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতি, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি নিবন্ধন নির্দেশিকা।
সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অনলাইন ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা এবং ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ই-ভ্যালিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
অনলাইন ব্যবসায় প্রতারণার আলোচিত ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউ-কম, ধামাকা শপিং ও আলিশা মার্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মোট ৫৮ হাজার ৭২০টি আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে গ্রাহকদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
এই বিপুলসংখ্যক অভিযোগ অনলাইন ব্যবসা খাতে কার্যকর নজরদারি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২২ সাল পর্যন্ত ছিল না আলাদা আইনগত কর্তৃপক্ষ
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি ও নিবন্ধনের জন্য কোনো পৃথক আইনগত কর্তৃপক্ষ ছিল না।
পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি নিবন্ধন নির্দেশিকা জারি করে। এর আওতায় অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হয় যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি)।
সরকারি হিসাবে, এ পর্যন্ত আরজেএসসি প্রায় ১ হাজার ৯০২টি অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল নিবন্ধন দিয়েছে।
এতে অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় ও কার্যক্রমকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে অনলাইন ব্যবসার ক্রমবর্ধমান পরিধির তুলনায় নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার।
গ্রাহকের টাকা উদ্ধারে অগ্রগতি
অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ পাওয়ার পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত বিভিন্ন অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫৩১ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭২ কোটি টাকা ইতোমধ্যে প্রকৃত ভোক্তাদের হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে।
বাকি অর্থ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত ভোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ভোক্তাদের অর্থ উদ্ধারের এই প্রক্রিয়াকে অনলাইন ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নজরদারি জোরদারে নতুন কাঠামোর প্রয়োজন
অনলাইন ব্যবসার পরিধি যত বাড়ছে, ততই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান, প্ল্যাটফর্ম ও ব্যবসায়িক মডেল। ফলে শুধু নিবন্ধন দেওয়ার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; ব্যবসা পরিচালনা, গ্রাহকের অর্থ গ্রহণ, পণ্য সরবরাহ, রিফান্ড এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়ার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
এ কারণে ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে অনলাইন ব্যবসার জন্য একটি আরও সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হবে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তাদের আস্থা বাড়তে পারে, অন্যদিকে সৎ ও নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোও একটি প্রতিযোগিতামূলক ও নিরাপদ পরিবেশ পাবে।
পাঠকের মন্তব্য