
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চীনের তিব্বত অংশে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দুই দেশে নিখোঁজ রয়েছেন সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ। দুর্গম ভূখণ্ড, বৈরী আবহাওয়া ও বিপুল পরিমাণ কাদা-পাথরের ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন উদ্ধারকারীরা।
গত বুধবার হিমালয় অঞ্চলে আঘাত হানা এই আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকা ও চীনের তিব্বত অঞ্চল। দুর্যোগের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে ও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রায় ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এসব প্রকল্পের বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে রাতদিন কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
উদ্ধারকারী দলের প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারেও আলো জ্বালিয়ে ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে কাদা ও পাথর সরানোর কাজ চলছে। সেনাসদস্যরা টর্চের আলো ব্যবহার করে খনন করা বড় গর্তের মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজছেন। উদ্ধারকাজে থাকা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকরাও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত রয়টার্সকে বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হলো সুড়ঙ্গগুলো দ্রুত খুলে দিয়ে সেখানে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা করা।
মরদেহ ব্যবস্থাপনাতেও বড় সংকট
জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি বন্যায় নিহতদের মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্ত করাও নেপালের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ চিতওয়ান পর্যন্ত পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকার কারণে অনেক মরদেহে পচন ধরেছে। এতে স্বাভাবিক উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চিতওয়ানের দেবঘাট এলাকার একটি বনাঞ্চলে বেওয়ারিশ মরদেহের গণকবর দেওয়া শুরু করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহ দ্রুত পচে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সে কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে দাফনের পরও যাতে ভবিষ্যতে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কবরের অবস্থান ও শনাক্তকরণ চিহ্ন সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে মরদেহ উত্তোলন করে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ডিএনএ বিশ্লেষণে নেপালকে সহায়তা করছে ভারতের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল। চীনের একটি দলের সঙ্গেও এ বিষয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে।
নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকও
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও চীনের নাগরিকদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, অন্তত ৪৩ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও ১২৮ জনও নিখোঁজ রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি এবং অব্যাহত বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
চীনের তিব্বতেও ব্যাপক উদ্ধার অভিযান
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের সন্ধানে দুই হাজার ১০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে চীন। ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সম্মুখসারির উদ্ধারকারীদের কাছে বিমান থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে ১১৭ জন দমকলকর্মী এবং ১৩টি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুরও মোতায়েন করা হয়েছে।
সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় এক মিটারেরও বেশি পুরু পলির স্তর জমেছে। এতে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরু পলির নিচে মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন উদ্ধারকারীরা।
এদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় সৃষ্টি হওয়া হ্রদসদৃশ জলাধারটি প্রাকৃতিকভাবেই পানি ছেড়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও জিরং এলাকায় মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
চীন এই ভয়াবহ বন্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা থেকে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
তিব্বত মালভূমিতে এ ধরনের ঘটনাকে ‘ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগের নতুন ও ক্রমবর্ধমান বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন ও পানির প্রবাহের আকস্মিক বৃদ্ধি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এ বছরের শুরুতে দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য বৈঠক হওয়ার পরও হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীন নেপালের সঙ্গে পর্যাপ্ত তথ্য ভাগ করেনি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দুই নেপালি কর্মকর্তা। তাঁদের আশঙ্কা, তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
‘নজিরবিহীন দুর্যোগ’ বললেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই বন্যাকে ‘নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দুর্গম ভূখণ্ড, প্রতিকূল আবহাওয়া ও চলমান ঝুঁকির কারণে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযানে বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
দুর্যোগের কয়েক দিন পরও নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একদিকে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ও নদীর তীরে নিখোঁজদের সন্ধান—সব মিলিয়ে উদ্ধারকারীদের জন্য প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে উঠেছে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই।
এই বিপর্যয়ে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যার পরবর্তী সময়ে মরদেহ ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনও দুই দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য