
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রংপুর নগরীর কামালকাছনা দাসপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কায় প্রথমে তাকে এবং পরে পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। চারজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আদালতে আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যেরও মিল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে সীমান্ত দাস, সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। ছাদের পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। একপর্যায়ে ভোর হলে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন।
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর সিদ্ধার্থ তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে দেন এবং দুই দিক থেকে গামছা টানার পর তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করলে আসামিরা তাদেরও হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
এরপর আসামিরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও আলমারি এলোমেলো করেন। হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর জন্য তারা এভাবে পরিস্থিতি সাজানোর চেষ্টা করেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ জানায়, এ সময় পরিবারের এক শিশুকে ঘুম থেকে উঠতে দেখেন আসামিরা। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনে তার নাম ধরে ডাকায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি বাড়িতে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার সম্ভাব্য ফুটেজ নষ্ট করারও চেষ্টা করা হয়। পুলিশের দাবি, আসামিরা প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন। পরে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করে কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ইয়াবা কেনার টাকা জোগাড় করতে এর আগে মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন আসামিরা। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে নেওয়া ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সিদ্ধার্থের ভাগে পাওয়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। এমনকি ঘটনার পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবে স্বর্ণের দোকানে কাজে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, সীমান্ত দাসের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি এবং সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বক্তব্যে ঘটনার মূল বর্ণনায় বেশ কিছু মিল রয়েছে। ইয়াবা সেবনের জন্য ছাদে যাওয়া, গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা পড়া, এরপর পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা—এসব বিষয়ে আসামিদের বক্তব্যে সামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
তবে ইয়াবা সেবনের সংখ্যা নিয়ে দুই আসামির জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
এদিকে ঘটনার সঙ্গে ইয়াবা সরবরাহের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে শনাক্ত ‘শান্ত’কে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকা এবং হত্যার পেছনে থাকা বিষয়গুলোও স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পাঠকের মন্তব্য