

ই-বাংলাদেশ রিপোর্ট
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ‘করসাথী’ নামে একটি ডিজিটাল চ্যাটবট সেবা চালু করতে যাচ্ছে। কর-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবা সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেশের কর সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে এই সেবাকে ঘিরে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘দেশীয় রাজস্ব আহরণ শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় চ্যাটবটটি চালু করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান জানান, করসাথীকে করদাতাদের ডিজিটাল বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষ তাদের কর-সংক্রান্ত দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা বুঝতে, এনবিআরের বিভিন্ন সেবা নিতে এবং স্বয়ংক্রিয় কর প্রশাসনব্যবস্থা সহজে ব্যবহার করতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এমন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলোর একটি হলো করসাথী।’
প্রকল্প পরিচালক জানান, বৃহত্তর ‘এসডিআরএম’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কাগজপত্রের ব্যবহার ও সরাসরি শারীরিক যোগাযোগ কমানো, স্বচ্ছতা বাড়ানো, সেবা প্রদানের গতি বাড়ানো এবং এনবিআরকে আরও করদাতাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
চ্যাটবটটি সহজ কথোপকথনভিত্তিক ব্যবস্থায় আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্য এবং নির্দেশনা দেবে। কর আইন, বিধিমালা, পদ্ধতি, ফরম, পরিপত্র ও বিশেষ সাধারণ আদেশ (এসআরও) সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি করদাতাদের সাধারণ সেবা গ্রহণ ও কর-পরিপালনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেবে এটি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও করদাতাদের সহায়তা করবে চ্যাটবটটি। কোন কাজ করতে হবে, কোথায় যেতে হবে এবং কী ধরনের নথি বা তথ্য প্রয়োজন হতে পারে—এসব বিষয়ও জানিয়ে দেবে। প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট এনবিআর সেবা বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাবে।
এ ব্যবস্থার ফলে করদাতাদের সশরীরে অফিসে যাওয়া এবং ম্যানুয়ালভাবে তথ্য জানার ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে করদাতা ও এনবিআরের কর্মকর্তাদের—উভয়ের সময় সাশ্রয় হবে।
চ্যাটবটটি একই ধরনের ও মানসম্মত তথ্য সরবরাহ করবে। ফলে একাধিক উৎস থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়ার কারণে করদাতাদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা কমবে। চূড়ান্ত সিস্টেম নকশা ও সেবার প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে করসাথী দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা করদাতাদের সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে।
সেবাটি সংশ্লিষ্ট সরকারি ডেটাবেসের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। এর ফলে করদাতারা জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন কর-সংক্রান্ত নথি ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বৃহত্তর ‘করবন্ধু’ সেবার আওতায় করদাতারা আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর), আমদানি পর্যায়ে পরিশোধ করা ভ্যাট, অগ্রিম কর পরিশোধ এবং কর ফেরতের আবেদনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে পারবেন।
২০২৬ সালের রাজস্ব সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে দেওয়া একটি উপস্থাপনায় প্রস্তাবিত এই ডিজিটাল সেবা কীভাবে সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে করদাতাদের জন্য সহজ করতে পারে, তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।
উপস্থাপনায় একটি উদাহরণে দেখানো হয়, একজন করদাতা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে ব্যাংকে গেলেন। কিন্তু তাঁর করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) কিংবা প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি ছিল না। অ্যাপ ও এর চ্যাটবট ব্যবহার করে ওই করদাতা বিদ্যমান জটিলতার মুখোমুখি না হয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা নিতে সক্ষম হন বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
অন্য একটি উদাহরণে, একজন ব্যবসায়ী নারী ‘করবন্ধু’ অ্যাপ ব্যবহার করে ভ্যাট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নেন। এর মধ্যে আমদানি পর্যায়ে পরিশোধ করা ভ্যাটের তথ্য পাওয়া এবং ভ্যাট ফেরতের আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা নেওয়ার বিষয়টিও ছিল।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি শারীরিক যোগাযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসন আরও স্বচ্ছ, সহজলভ্য ও কার্যকর হবে।
কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের পরিবর্তন এবং আরও করদাতাবান্ধব কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ‘করসাথী’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য