
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে, তবে এই সংকটের পুরো বোঝা বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
রোববার রাজধানীতে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) ও অক্সফাম ইন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছর: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের পথে’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশক পূর্তি শুধু অতীত ফিরে দেখার সময় নয়; এটি নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া, দায়িত্ব ভাগাভাগি করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময়। টেকসই সমাধান ছাড়া আরেকটি দশক পার হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, একটি সরকারের জন্য ১০ বছর একটি নীতিচক্র, আর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সময়। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য ১০ বছর মানে পুরো শৈশব হারিয়ে ফেলা। একজন তরুণের জন্য এটি শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারানো। একটি পরিবারের জন্য এটি এক দশক ঘরহীন জীবন। পুরো একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠা।
বাংলাদেশ এক দশক ধরে আশ্রয় দিচ্ছে
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে দেশটি মানবিক অবস্থান থেকে তাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, সীমিত ভূমি ও উচ্চ জনঘনত্বের মধ্যেও বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে দেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
এরপরও মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে বাংলাদেশের এই মানবিক উদারতা আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না বলে সতর্ক করেন শামা। তার ভাষায়, বাংলাদেশ আশ্রয় দিতে পারে এবং মানবিক সহায়তা দিতে পারে; কিন্তু যে সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, সেই সংকটের স্থায়ী সমাধান একা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
অর্থায়ন কমায় উদ্বেগ
২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থায়ন কমলেও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন কমেনি।
খাদ্য, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, শিক্ষা ও সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো শরণার্থীদের বেঁচে থাকার মৌলিক প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বড় ধরনের অর্থায়ন ঘাটতি দেখা দিলে এর প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শরণার্থী ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন শামা।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানবিক সহায়তায় ক্লান্তি যেন মানবিক পরিত্যাগে পরিণত না হয়।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাপও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান
রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও জনসেবা দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে। তাই রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তাকেও অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবদানের প্রশংসা করে শামা বলেন, শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পছন্দ নয়; সংকট সমাধানের একমাত্র টেকসই পথ।
রোহিঙ্গারা বারবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে শামা বলেন, কোনো শরণার্থী শিবির কখনোই একজন মানুষের নিজ মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়টিও যাচাই প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, সঠিক তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকবে
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় চ্যানেল, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে বলে জানান শামা ওবায়েদ।
চীনের ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দেশটির নেতৃত্বের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, দায়িত্ব ভাগাভাগি শুধু সহানুভূতি প্রকাশ বা সংহতির বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর অর্থ হতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ, পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি।
প্রত্যাবাসনে আশাবাদী সরকার
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় এক দশক আগে একটি মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাংলাদেশের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারও সফলভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন শামা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য-প্রমাণ ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সংকট তুলে ধরার ওপর তিনি জোর দেন।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ত্রাণনির্ভরতা থেকে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংহতি থেকে দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং মানবিক ব্যবস্থাপনা থেকে কার্যকর রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুধু বেঁচে থাকার অধিকারই রাখে না; তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিজস্ব ঘর, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারও রয়েছে।
সংলাপে রোহিঙ্গা সংকট, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা, মানবিক সহায়তার ঝুঁকি ও সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন উপস্থাপনা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, বই প্রকাশ এবং কারিগরি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
পাঠকের মন্তব্য