ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম বড় মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) যোগ দিতে জোর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। জোটটির সদস্যপদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে আরসেপের উচ্চমানের বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কার কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আরসেপে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোটভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশের সদস্যপদের পক্ষে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। এর ফলে জোটের ১৫ সদস্য দেশের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার আশাবাদ
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা ও নতুন বাজার তৈরির চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে। এ অবস্থায় আরসেপের মতো বড় বাণিজ্য জোটে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরসেপের সদস্য হলে জোটভুক্ত দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য ও সেবার জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় বাজার উন্মুক্ত হতে পারে।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর আরসেপে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করে বাংলাদেশ। ওই সময় জোটটিতে অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্মতিপত্র পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, চিলি ও হংকং আরসেপের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছে।
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের সমর্থন
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান জানিয়েছেন, আরসেপে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের সদস্যপদের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
এর আগে মিয়ানমার ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা করা হয়। নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও বৈঠকে এ বিষয়ে সমর্থন চাওয়া হয়েছে। দেশটি আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের সমর্থন আগেই ছিল। এখন অস্ট্রেলিয়ার সমর্থনের আশ্বাস পাওয়ায় জোটের সব সদস্য দেশের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে।
আরসেপ কী?
২০২০ সালের নভেম্বরে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আসিয়ানভুক্ত ১০ দেশকে নিয়ে আরসেপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে চুক্তিটি কার্যকর হয়।
বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই বাণিজ্য জোট। ১৫টি সদস্য দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ২৩০ কোটি এবং তাদের বাজারের আকার প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত আরসেপের আওতায় আগামী ২০ বছরের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে ধাপে ধাপে অধিকাংশ আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে বা প্রত্যাহার করতে হবে।
শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, টেলিযোগাযোগ, মেধাস্বত্ব, ব্যাংক-বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সেবা, ই-কমার্স এবং পেশাদার সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতও এই চুক্তির আওতাভুক্ত।
আরসেপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রুলস অব অরিজিন’। অর্থাৎ কোনো পণ্য কোন দেশের উৎপাদিত বা উৎসজাত হিসেবে বিবেচিত হবে, সে বিষয়ে অভিন্ন নিয়ম রয়েছে। এর ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সংস্কারে জোর বাংলাদেশে
আরসেপের সদস্যপদ পাওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিভিন্ন সংস্কার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাঠামোকে জোটটির বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাতকে আরও উন্মুক্ত করতে ‘পজিটিভ লিস্ট’ থেকে ‘নেগেটিভ লিস্ট’ পদ্ধতিতে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে আরসেপের আওতায় সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সুবিধা চেয়েছে। আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের মতো বাংলাদেশকেও ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএ নিয়েও আলোচনা
আরসেপের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ।
ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ এফটিএ আলোচনার বিষয়ে সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছে। প্রস্তাবিত এফটিএ কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার আরও উন্মুক্ত হতে পারে।
নিউজিল্যান্ড আগামী ৭ নভেম্বর দেশটির জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে।
এলডিসি উত্তরণেও সমর্থন চাওয়া
এদিকে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়েও নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আরসেপে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আবেদন পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।
আরসেপের মতো বৃহৎ বাণিজ্য জোটে যুক্ত হতে পারলে এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাঠকের মন্তব্য