![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সাধারণ একটি ভাড়া বাসা। বাইরে থেকে দেখলে সেখানে সন্দেহ করার মতো কিছুই ছিল না। মাসে মাত্র চার হাজার টাকায় গত ৫ আগস্ট বাসাটির একটি কক্ষ ভাড়া নেন আব্বাস আলী নামের এক ব্যক্তি। বাড়িওয়ালাকে তিনি জানিয়েছিলেন, পেশায় প্রাইভেট কার চালক। সন্তানদের পাশের স্কুলে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা থেকেই বাসাটি ভাড়া নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে কয়েক দিন পরই ওই বাসাকে ঘিরে তৈরি হয় সন্দেহ। দিনের বেলায় ভাড়াটিয়াকে খুব একটা দেখা না গেলেও রাতে কিছু জিনিসপত্র আনা-নেওয়া হতো। মাঝেমধ্যে নিচতলা থেকে ভারী কিছু রাখার শব্দও শুনতে পেতেন স্থানীয়রা।
শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে বাসাটিতে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে মোট ১৩টি পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুর এলাকার ওই বাসায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অভিযান শেষ হয় রাত পৌনে ২টার দিকে। অভিযানের শুরুতে পাঁচটি পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে আরও আটটি বোমা উদ্ধার করা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩টিতে।
পানির পাইপেই তৈরি করা হয়েছিল বোমা
তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে উদ্ধার হওয়া বোমাগুলোর গঠন। পুলিশের দাবি, বাসাবাড়ির পানির লাইনে ব্যবহৃত সাধারণ পাইপ ব্যবহার করেই এসব পাইপ বোমা তৈরি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় নাশকতার সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পুরো চক্রটির অন্যতম প্রধান কারিগর নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ এখনো পলাতক।
সিটিটিসি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে যে ছাতাবোমা উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটিও একই চক্রের তৈরি বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।
পুলিশের দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের প্রশিক্ষক হিসেবে পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সে আবারও আরিফসহ ১৫ থেকে ২০ জনকে নিয়ে একটি গোপন সেল গঠন করে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ ব্রিফিং করার কথা রয়েছে সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হকের।
আশুলিয়ার বোমার সঙ্গে মিল
তদন্তকারীরা বলছেন, হেমায়েতপুরের এই বাসার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া আরও কয়েকটি বোমার যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া প্রেশার কুকার বোমাটিও হেমায়েতপুরের ওই বাসায় তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। ওই বোমার সূত্র ধরেই মোহাম্মদ আরিফের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন এলাকায় উদ্ধার হওয়া পাইপ বোমার সঙ্গেও সাভার থেকে উদ্ধার করা বোমার গঠনে মিল পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
ফলে তদন্তের পরিধি এখন শুধু হেমায়েতপুরের বাসা থেকে ১৩টি বোমা উদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। একই ধরনের বোমা বিভিন্ন ঘটনায় একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি ও সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
টিএটিপি উদ্ধারে বাড়ছে তদন্তের পরিধি
হেমায়েতপুরের বাসা থেকে টিএটিপি (ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড) পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সিটিটিসি। গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনায়ও একই ধরনের বিস্ফোরক উপকরণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেরানীগঞ্জ ও সাভারের ঘটনায় ব্যবহৃত উপকরণ ও ঘটনার ধরনে মিল থাকায় দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ কারণে তদন্ত এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। আগের কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ও উদ্ধারের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গেও হেমায়েতপুরের বাসাটির যোগাযোগ ছিল কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এক ব্যক্তিকে ঘিরে একাধিক ঘটনার তদন্ত
গত ২৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের উম্মুল কুরা মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নব্য জেএমবির সদস্য সন্দেহে আগে গ্রেপ্তার হওয়া আল আমিনের সহযোগী হিসেবে তখনই মোহাম্মদ আরিফের নাম সামনে আসে।
এরপর একাধিক ঘটনায় আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফেব্রুয়ারিতে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় ছুরিকাঘাত করে বোমার ব্যাগ ফেলে পালানোর ঘটনা, মার্চে কুমিল্লার শিবমন্দিরে বিস্ফোরণ এবং একই মাসে সায়দাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরিফের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই হেমায়েতপুরে বোমা তৈরির কথিত আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায় বলে পুলিশের দাবি।
‘গুরু’র সন্ধানে তদন্ত
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ তার একজন ‘গুরু’র কথা বলেছেন।
পুলিশের দাবি, ওই ব্যক্তি পেশায় একজন হোমিও চিকিৎসক।
তদন্তকারীরা এখন ওই ব্যক্তির পরিচয়, নাশকতার পরিকল্পনায় তার ভূমিকা এবং হেমায়েতপুরের বাসার সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
সব মিলিয়ে হেমায়েতপুরের একটি সাধারণ ভাড়া বাসা থেকে ১৩টি পাইপ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নাশকতার একটি বড় নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য অস্তিত্ব সামনে এসেছে। একই ধরনের বোমা বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারের ঘটনা এবং বিস্ফোরক তৈরির উপকরণে মিল পাওয়ায় তদন্তকারীরা ঘটনাগুলোকে একই সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করছেন। তবে এসব ঘটনায় কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পাঠকের মন্তব্য