![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
কূটনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু থাকে না; যা থাকে তা হলো জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক প্রয়োজন এবং আলোচনার সুযোগ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের ধারা সেই পুরোনো কূটনৈতিক সত্যটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কূটনীতিতে কোনো দরজাই চিরদিনের জন্য বন্ধ রাখা যায় না। মতপার্থক্য যতই গভীর হোক না কেন, আলোচনার পথ খোলা রাখাই রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয় থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সমস্যাকে বৈরিতায় পরিণত করলে ক্ষতি হয় উভয় পক্ষেরই। বরং সংকট যত বেশি ঘনীভূত হয়, সংলাপের প্রয়োজনীয়তাও তত বেশি অনুভূত হয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। ভিসা কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রিতা, কূটনৈতিক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, সীমান্তকেন্দ্রিক বিরোধ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি কিছুটা দুর্বল হয়েছিল। দুই দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগও নানা বাধার মুখে পড়েছিল। তবে জনগণের আবেগ আর রাষ্ট্রীয় কূটনীতিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো প্রতিবেশী দেশের জনগণের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ বা অসন্তোষ থাকতেই পারে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল সরকার কেবল আবেগ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের যোগাযোগ বজায় রাখতে হয় এবং মতপার্থক্যের বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি আদৌ ভারতনির্ভরতা কমাতে পেরেছে? পরিসংখ্যান এবং বাজার বিশ্লেষণ তা বলে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য পর্যন্ত ভারত থেকে আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অথচ ভিসা জটিলতা, সীমান্ত সমস্যা ও বাণিজ্যিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নানা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ভাষ্যে যতই দূরত্বের সুর থাকুক না কেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে পরস্পরের কাছাকাছি থাকতে বাধ্য করেছে।
প্রতিদিনের জীবনযাত্রার দিকে তাকালেই এই পারস্পরিক নির্ভরতার প্রমাণ মিলে যায়। কোনো কৃষিপণ্যের হঠাৎ সংকট তৈরি হলে নিকটবর্তী দেশ থেকে দ্রুত আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়। কাঁচা মরিচ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। এই ছোট উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক কেবল উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও সরাসরি প্রভাবিত করে।
পররাষ্ট্রনীতির নতুন ধারা ও বাস্তববাদী পদক্ষেপ:
পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য কেবল বিদেশ সফর বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মূল বিষয় হলো, সেই যোগাযোগ দেশের জন্য কী বাস্তব সুফল বয়ে আনছে। অতীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানামুখী তৎপরতার কথা বলা হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ কিংবা নাগরিকদের জন্য বিদেশে যাতায়াত সহজ করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আসেনি। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে চলেছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আরও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো ছাড়া বিকল্প নেই।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বেশি বাস্তববাদী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থার তুলনামূলক উন্নতি এবং বৈশ্বিক ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত হওয়া ইতিবাচক কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা দিয়েছে। শ্রমবাজার পুনরায় সক্রিয় করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ করার প্রচেষ্টায় পররাষ্ট্রনীতি এখন কেবল রাজনৈতিক বৃত্তে আবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তববাদী অবস্থান দৃশ্যমান। সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে, যা দুই দেশের জন্যই সুফল বয়ে আনতে পারে।
অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানের পথ:
সামনে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে এবং তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবে ঝুলে আছে। এছাড়া সীমান্ত হত্যা, পুশইন এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর করা জরুরি। বন্ধুত্বের অর্থ এই নয় যে সব বিষয়ে উভয় দেশকে একমত হতে হবে; আবার মতপার্থক্য মানেই যে শত্রুতা, এমন ধারণাও কূটনীতিতে অচল। একটি পরিণত রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে যেমন অনড় থাকে, তেমনি অন্য দেশের সংবেদনশীলতাও সমানভাবে শ্রদ্ধা করে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে। এর অর্থ কোনো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের স্বার্থ রক্ষা করাও সমানভাবে জরুরি। ভারতের দিক থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে, বাংলাদেশকে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং সমমর্যাদার প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
ভবিষ্যৎ করণীয়:
ভূগোল, ইতিহাস এবং অর্থনীতি বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংঘাত বা অনাস্থা কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না; সহযোগিতা ও পারস্পরিক আলোচনাই হলো ভবিষ্যতের একমাত্র পথ। অতীতের টানাপোড়েন ও মানসিক দূরত্ব পেছনে ফেলে দুই দেশ যদি সমতা, আস্থা এবং জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে সামনে এগিয়ে যায়, তবে সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার—প্রতিবেশীর সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব অবশ্যই কাম্য, তবে তা হতে হবে আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে। দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই প্রতিবেশী কূটনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য