![]()
আহমেদ তোফায়েল
একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো। পদ মাত্র একটি। অথচ সেই পদের জন্য আবেদন করলেন কয়েক শ মানুষ। তাঁদের কেউ সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছেন, কেউ বছরের পর বছর চাকরি খুঁজছেন, আবার কেউ আগের চাকরি হারিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় আছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক গবেষণার একটি তথ্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। গবেষণা বলছে, প্রতি শূন্য পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন প্রতিযোগিতা করছেন। মহামারির আগে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে একটি চাকরির জন্য প্রতিযোগীর সংখ্যা প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
বিআইডিএস ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪৭ সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। দেশের বড় একটি অনলাইন জব পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি, শূন্য পদ, আবেদন এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব দেখা হয়েছে। গবেষণার সময় প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের সংখ্যা ছিল গড়ে ৩ হাজার ৬৪৬টি। বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার। অর্থাৎ সমস্যা শুধু চাকরি নেই—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা হলো, চাকরির সুযোগ কমার তুলনায় কর্মসংস্থানের প্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।
যদিও মহামারির পর অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে। ব্যবসা খুলেছে, উৎপাদন বেড়েছে, বিনিয়োগের কিছু ক্ষেত্রও ফিরেছে। কিন্তু শ্রমবাজারে সেই পুনরুদ্ধার সমান গতিতে হয়নি। এর একটি কারণ হতে পারে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উদ্যোক্তারা শুধু বর্তমান চাহিদা দেখেন না। তাঁরা ভবিষ্যৎ বিক্রি, উৎপাদন ব্যয়, সুদের হার, জ্বালানি, কাঁচামালের দাম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ বিবেচনা করেন।
যখন এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তখন নতুন কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যায়। বিদ্যমান কর্মীদের দিয়েই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা চলে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা বাড়লেও নতুন চাকরির সৃষ্টি সেই অনুপাতে নাও বাড়তে পারে।
শিক্ষিত তরুণদের জন্য প্রতিযোগিতা কেন বেশি:
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশিত চাকরির বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ফলে একটি সীমিত সংখ্যক ভালো চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, বহুজাতিক কোম্পানি এবং সরকারি চাকরিতে আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে আরেকটি বাস্তবতা আছে। শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ যে ধরনের চাকরি চান, বাজারে সেই ধরনের চাকরি যথেষ্ট তৈরি হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর যদি কয়েক বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাঁর দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগও কমে যায়। দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থানের বাইরে থাকলে কাজের অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হয়। এতে পরবর্তী সময়ে চাকরি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সংকট একসময় নিজেই একটি চক্র তৈরি করতে পারে।
শুধু চাকরি নয়, ভালো চাকরির সংকটও আছে:
শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই কর্মসংস্থানের সংখ্যা সামনে আসে। কিন্তু চাকরির মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন তরুণ হয়তো কোনো কাজ পাচ্ছেন। কিন্তু সেই কাজের বেতন যদি তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, দক্ষতা বিকাশের সুযোগ না থাকে কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে সেটিকে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান বলা কঠিন।
এ কারণেই প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা শ্রমবাজারের চাপ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এটি পুরো শ্রমবাজারের চিত্র নয়। বাংলাদেশের বড় অংশের কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে। অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য মূলত প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির বাজারকে প্রতিফলিত করে। তবু এই তথ্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার অর্থ হলো শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক তুলনাও স্বস্তিদায়ক নয়:
মহামারির সময় বাংলাদেশের চাকরির বাজারে ধাক্কার মাত্রা আন্তর্জাতিক তুলনায়ও বড় ছিল। গবেষণায় বলা হয়েছে, ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য পদ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল। যুক্তরাজ্যে কমেছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই পতন ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। অবশ্য অর্থনীতির কাঠামো, শ্রমবাজারের বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থায় দেশগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মহামারি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দুর্বল জায়গাগুলোকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বিশেষ করে নতুন নিয়োগের ওপর অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব কতটা দ্রুত পড়ে, সেটি তখন দেখা গেছে।
সমাধান কোথায় :
প্রথম কাজ হওয়া উচিত চাকরির বাজারকে শুধু চাকরিপ্রার্থীর সমস্যা হিসেবে না দেখা। কর্মসংস্থান তৈরি মূলত বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত। তাই নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
ব্যবসার খরচ কমানো, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা বাড়ানো, অর্থায়নের সুযোগ সহজ করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের সম্প্রসারণের সক্ষমতা বাড়বে। এর সঙ্গে বাড়তে পারে নতুন চাকরিও।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোন খাতে কর্মী প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের কাজের ধরন কী—এসব বিবেচনায় প্রশিক্ষণ ও কারিকুলাম সাজানো দরকার।
তৃতীয়ত, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশও শক্তিশালী করতে হবে। সবাইকে চাকরি দেওয়ার অর্থনীতি সম্ভব নয়। কিন্তু এমন অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব, যেখানে একজন উদ্যোক্তা নিজে চাকরি নেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও চাকরি তৈরি করবেন।
সবশেষে প্রয়োজন নিয়মিত শ্রমবাজারের তথ্য। কোন খাতে কত চাকরি তৈরি হচ্ছে, কোন খাতে নিয়োগ কমছে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন।
একটি পদের বিপরীতে ২৮৭ জনের প্রতিযোগিতা তাই শুধু চাকরিপ্রার্থীদের দুর্ভোগের গল্প নয়। এটি অর্থনীতির একটি গভীর সংকেত। কর্মসংস্থানের সুযোগ যদি মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে শিক্ষিত তরুণদের হতাশা বাড়বে, দক্ষতার অপচয় হবে এবং অর্থনীতির সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্নটি তাই শুধু ‘কত চাকরি আছে’—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে কত নতুন ও মানসম্মত চাকরি তৈরি করা যাবে। সেই উত্তর নির্ভর করবে বিনিয়োগ, উৎপাদন, দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক নীতির ওপর। শ্রমবাজারের এই কঠিন বাস্তবতাকে এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কারণ ২৮৭ জনের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত শুধু একটি চাকরির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের গল্প।
পাঠকের মন্তব্য