ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার দেশটির কর্মসংস্থান বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র, প্রযুক্তি ও সেবা খাত—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে থাকায় বহু কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং জীবিকা রক্ষার লড়াই এখন লাখো মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চীনের বিভিন্ন শহরে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে শ্রমবাজারে চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে উহান শহরে চালকবিহীন ‘অ্যাপোলো গো’ রোবোট্যাক্সি চালু হওয়ার পর থেকে অনেক ট্যাক্সিচালকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রোবোট্যাক্সির কারণে কমেছে আয়
উহানের ট্যাক্সিচালক ইয়াও সিননের দাবি, ২০২২ সালে রোবোট্যাক্সি চালুর পর তার আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। সম্প্রতি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে কিছুদিন রোবোট্যাক্সি বন্ধ থাকায় আবারও যাত্রী ফিরে পেয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, এআইভিত্তিক যানবাহন শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
একজন নারী ট্যাক্সিচালকও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে এমন প্রযুক্তির বিস্তার অনেকের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
শুধু চালকরাই নন, ঝুঁকিতে সাদা-কলার চাকরিও
এআইয়ের প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ নেই। চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং অফিসভিত্তিক বিভিন্ন পেশাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে।
দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করা চিত্রগ্রাহক তিয়ান জেমিন জানান, কয়েক বছর আগেও যেসব কাজ করতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হতো, এখন তার অনেকটাই এআই সফটওয়্যার দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের আয় কমে যাচ্ছে এবং নতুন কাজ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার মতে, এআইয়ের উন্নয়ন এত দ্রুত হচ্ছে যে অনেক পেশাজীবী নিজেদের দক্ষতা পরিবর্তনের সুযোগই পাচ্ছেন না।
সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এআইকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বজনীন সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করলেও, কর্মসংস্থান সংকট নিয়ে এখন সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ওয়ার্কার্স ডেইলি-র এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এআই যুগে কর্মসংস্থানের অধিকার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে বিদ্যমান শ্রমনীতি সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে চীনের কিছু আদালত ইতোমধ্যে এমন কয়েকটি মামলায় চাকরিচ্যুত কর্মীদের পক্ষে রায় দিয়েছেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের পরিবর্তে এআই ব্যবহার করেছিল।
কেন তুলনামূলক সুবিধায় থাকতে পারে চীন?
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তি খাতের ওপর সরকারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকায় এআইজনিত কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
প্রয়োজনে সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দিতে পারে কিংবা কর্মসংস্থান রক্ষায় বিশেষ নীতি গ্রহণ করতে পারে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি এত দ্রুত যে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইকে পুরোপুরি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার দক্ষতা অর্জনই ভবিষ্যতের কর্মবাজারে টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হবে।
তবে যেসব কাজ ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, সেসব খাতের কর্মীদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারে আরও বড় ধরনের পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।