ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সেউতায় ৬০ হাজার অভিবাসীর ঢল, ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে উত্তপ্ত স্পেন
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা সীমান্ত দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ৬০ হাজারের বেশি অভিবাসীর প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা তীব্র হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেন সরকারের একজন মন্ত্রী। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
শুক্রবার জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে স্পেন সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ইসরায়েলকে সমালোচনা করার সুযোগ স্পেন কখনো হাতছাড়া করে না, অথচ নিজেদের অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় সেউতায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে। পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহলগুলো এখনো কেন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ড্যাননের ওই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে বলেন, “আচ্ছা, তাহলে বিষয়টি বেশ পরিষ্কারই হয়ে যাচ্ছে।” তার এই মন্তব্যের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
এদিকে স্পেনের কয়েকজন রাজনীতিক ও বিশ্লেষক দাবি করেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে স্পেন সরকারের অবস্থানের কারণে মাদ্রিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই সংকটকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
বামপন্থী দল রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়া (ইআরসি)-এর সংসদীয় মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল রুফিয়ান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ করছে।
এদিকে স্প্যানিশ সাংবাদিক হোসে ভিজনার ২০১৯ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুর একটি পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট সামনে আনেন। সেখানে সেউতা নিয়ে বিতর্কিত কিছু মন্তব্য ছিল বলে দাবি করা হয়।
স্পেনের জনপ্রিয় অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে সেউতার অভিবাসী সংকটের পেছনে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে পর্তুগালের সাবেক মন্ত্রী ও বিশ্লেষক ব্রুনো মাকাইস বলেন, ঘটনার আগে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল সরাসরি জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে ঘটনার পর তারা বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে বলে তার ধারণা।
স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিশু, সেউতায় প্রবেশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকে সাঁতরে, আবার কেউ ভাসমান রিং ব্যবহার করে সমুদ্রপথে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন।
অভিবাসীদের এই ঢলকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে নজরদারি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইতালি প্রয়োজন হলে স্পেনকে সাময়িকভাবে শেনজেন অঞ্চল থেকে স্থগিত করার দাবি তোলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে শনিবার স্পেন সরকার জানায়, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪৮ হাজার অভিবাসীকে ইতোমধ্যে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের একদিনে সীমান্ত অতিক্রম করা মরক্কোর নীরব সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। বার্সেলোনার পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসনবিষয়ক গবেষক লোরেঞ্জো গ্যাব্রিয়েলি বলেন, মরক্কোর ভূমিকা ছাড়া একদিনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সীমান্ত অতিক্রম করা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে স্পেনে নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূত কারিমা বেনইয়াইচ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, মরক্কো সবসময় বৈধ, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনকে সমর্থন করে এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত পারাপারের ঘটনাগুলো সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতিকে “বিপর্যয়” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারত।
বর্তমানে সেউতা সীমান্ত পরিস্থিতি, অভিবাসীদের অনুপ্রবেশের প্রকৃত কারণ এবং বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে ইসরায়েল বা অন্য কোনো দেশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি।
পাঠকের মন্তব্য