![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
বাংলাদেশের আবাসন খাত গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাতে পরিণত হয়েছে। এই খাত শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ করে না; এটি নগরায়ণকে এগিয়ে নেয়, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং ইস্পাত, সিমেন্ট, রড, ইট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাব, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসহ দুই শতাধিক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।
ফলে এই খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভেতরে যখন বিরোধ প্রকাশ্যে আসে, তখন সেটি কেবল একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পুরো শিল্পের ভাবমূর্তি, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রিহ্যাবের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) এক মাসের জন্য স্থগিত হওয়ার ঘটনাও তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি এমন এক সংকেত, যা সংগঠনের ভেতরের সুশাসন, জবাবদিহি এবং নেতৃত্বের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও বিবেচনায় রয়েছে। তবে অভিযোগের ধরনই বলে দেয়, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে কী ?
রিহ্যাবের পরিচালনা পর্ষদের একাংশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে যে অভিযোগ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া সংগঠনের তহবিল থেকে দুই কোটি টাকা উত্তোলন, কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন না নেওয়া, গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করে বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন, কর্মচারী নিয়োগ ও অপসারণে অনিয়ম এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব।
এসব অভিযোগ আদালতে বা তদন্তে এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাই কোনো পক্ষকে আগেভাগে দোষী বলা সমীচীন হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাই যখন এমন অভিযোগ তোলেন, তখন বিষয়টি সাধারণ মতবিরোধের পর্যায়ে থাকে না। তখন সেটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কেন এজিএম গুরুত্বপূর্ণ:
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সাধারণ সভা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটিই সেই জায়গা, যেখানে আর্থিক হিসাব উপস্থাপন করা হয়, সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। এমন একটি সভা স্থগিত হওয়ার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করেছে অভিযোগগুলো যাচাই না করে সামনে এগোনো ঠিক হবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও শুনানি শেষে সরাসরি কোনো পক্ষ নেয়নি। বরং অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য সময় নিয়েছে এবং দুই পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করার পরামর্শ দিয়েছে। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ।
সংকটের সময় কেন আরও সতর্কতা প্রয়োজন:
বাংলাদেশের আবাসন খাত এমনিতেই কয়েক বছর ধরে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অনেক প্রকল্পে ফ্ল্যাট বিক্রির গতি আগের তুলনায় ধীর। একই সঙ্গে নিবন্ধন ব্যয়, করনীতি এবং নগর পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।
এই বাস্তবতায় রিহ্যাবের মতো সংগঠনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সরকারের সঙ্গে নীতিগত আলোচনায় এই সংগঠনই আবাসন খাতের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও সংগঠনের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আস্থাই এই শিল্পের সবচেয়ে বড় মূলধন:
আবাসন ব্যবসা মূলত আস্থার ব্যবসা। একজন ক্রেতা যখন একটি ফ্ল্যাট কেনেন, তখন তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস। অন্যদিকে ব্যাংকও ঋণ দেওয়ার সময় প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা ও ডেভেলপারের সুনাম বিবেচনা করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও একই বিষয় দেখেন।
এ কারণে খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠনকে ঘিরে অনিয়ম, দ্বন্দ্ব কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ পুরো শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান রিহ্যাবের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, তবু জনমনে সংগঠনের ভাবমূর্তি পুরো খাতের প্রতিনিধিত্ব করে।
সুশাসনের বিকল্প নেই:
বাংলাদেশে অনেক ব্যবসায়িক সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ সমস্যা দেখা যায়। সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে ব্যক্তি বা কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়। আর্থিক সিদ্ধান্তের যথাযথ নথিপত্র ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে মতবিরোধ দ্রুত সংঘাতে রূপ নেয়।
আধুনিক করপোরেট সুশাসনের মূলনীতি হলো—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ এবং নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একটি সংগঠনের গঠনতন্ত্র শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দলিল নয়; সেটিই সংগঠনের সংবিধান। সেটি উপেক্ষা করা হলে সদস্যদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
রিহ্যাব কেবল সদস্যদের নিবন্ধন নবায়ন বা মেলা আয়োজনের সংগঠন নয়। এটি সরকারের কাছে আবাসন শিল্পের দাবিদাওয়া তুলে ধরে। করনীতি, নগর উন্নয়ন, আবাসন অর্থায়ন, নির্মাণ আইন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
যদি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সরকারের সঙ্গে আলোচনায়ও তার অবস্থান দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ সদস্যদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
এটি কোনোভাবেই আবাসন শিল্পের জন্য ইতিবাচক নয়।
নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে উত্তরণের পথ:
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষতা। অভিযোগকারীদের বক্তব্য যেমন গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত নেতৃত্বকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।
যদি প্রয়োজন হয়, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সদস্যদের সামনে উন্মুক্ত করা যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাই হোক না কেন, পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ।
কারণ গোপনীয়তা নয়, বরং স্বচ্ছতাই আস্থা ফিরিয়ে আনে।
রিহ্যাবের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সংগঠনের সমস্যা নয়; এটি দেশের অন্যান্য ব্যবসায়িক সংগঠনের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। অনেক সময় নির্বাচন শেষে মতপার্থক্যকে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ দেওয়া হয়। এতে সংগঠনের মূল লক্ষ্য আড়ালে পড়ে যায়।
সংগঠনের শক্তি আসে সদস্যদের অংশগ্রহণ থেকে। নিয়মিত বোর্ড সভা, সিদ্ধান্তের লিখিত অনুমোদন, আর্থিক তথ্য প্রকাশ, কার্যকর নিরীক্ষা এবং গঠনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা—এসবই একটি সুস্থ সংগঠনের ভিত্তি।
সামনে করণীয় কী :
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হলো অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, সদস্যদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সব সিদ্ধান্ত স্বচ্ছভাবে জানাতে হবে। চতুর্থত, এজিএম যেন অযথা দীর্ঘ সময় ঝুলে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী রিহ্যাব মানেই একটি শক্তিশালী আবাসন খাত।
পরিশেষে, রিহ্যাবের এজিএম স্থগিত হওয়ার ঘটনাকে শুধু একটি সাংগঠনিক বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা জরুরি। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো যত বড় হবে, তাদের ওপর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশাও তত বাড়বে।
বর্তমান অভিযোগের তদন্তে সত্য যা-ই বেরিয়ে আসুক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা। কারণ বিচার শুধু হওয়া যথেষ্ট নয়; সেটি দৃশ্যমানভাবেও হতে হবে। তবেই সদস্যদের আস্থা ফিরবে, সংগঠনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং আবাসন খাত তার মূল কাজ—মানুষের আবাসনের স্বপ্ন পূরণে—আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
রিহ্যাবের এই সংকট শেষ পর্যন্ত কীভাবে সমাধান হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—সুশাসন, জবাবদিহি ও নিয়মের শাসনের কোনো বিকল্প নেই। যে সংগঠন এই তিনটি নীতিকে যত দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, ভবিষ্যৎ তার জন্য ততই স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
এন্ট্রাপ্রেনার বাংলাদেশ