ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতের সাম্প্রতিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন ছাত্র আন্দোলন শেষ হওয়ার পর নতুন এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক নারী শিক্ষার্থী ও তরুণীকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। তাদের পরিচয় প্রকাশ, ছবি বিকৃত করে প্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ভুয়া ছবি তৈরি এবং গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ২৫ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহারের আগে রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অনেকেই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আন্দোলনের সময় নারী-পুরুষ উভয় অংশগ্রহণকারীই সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। তবে আন্দোলন শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলত নারী আন্দোলনকারীদেরই আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট নারী আন্দোলনকারীদের ছবি ক্রপ করে তাদের পরিচয় প্রকাশ করছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। কোথাও কোথাও দিল্লি পুলিশকে ট্যাগ করে এসব তরুণীকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়েছে।
এদিকে আন্দোলন প্রত্যাহারের পরও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিহারে ৩০০ জনের বেশি, আসামে ১৩ জন এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও পরে বিহার ও আসাম সরকার গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছে।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশিত কিছু পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নারীও সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। আন্দোলনের সময় আলোচনায় আসা রিয়া যাদব আহির অনলাইনে তাকে অনুসরণ, হুমকি ও ট্রলের অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান অল্ট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জুবায়েরের দাবি, ভারতে বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের পর নারী অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার নতুন নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিকৃত ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা ব্যক্তিগত কনটেন্ট ব্যবহার করে নারী আন্দোলনকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়।
এদিকে ভারতীয় লেখক হুসাইন হায়দরি অভিযোগ করেছেন, এই অনলাইন প্রচারণার পেছনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) তথ্যপ্রযুক্তি সেলের ভূমিকা থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো, তাদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলা এবং সাধারণ মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক আন্দোলনের পর নারী অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে অনলাইন হামলা, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং পরিচয় প্রকাশের প্রবণতা উদ্বেগজনক। তারা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, এআই-নির্ভর ভুয়া ছবি এবং সমন্বিত অনলাইন হয়রানির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জবাবদিহি, তথ্য যাচাই এবং ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
পাঠকের মন্তব্য