![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমন্বিতভাবে ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র তুলে ধরেছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক শেষে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
আর্থিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সা। সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে এককভাবে ছয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৩২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা, আর একক শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ২৪ পয়সা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ইসলামী ব্যাংকের লোকসান হয়েছিল ২৮৮ কোটি টাকা। তবে এপ্রিল থেকে জুন—এই দ্বিতীয় প্রান্তিকেই লোকসানের পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা হয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মুনাফায় ছিল ইসলামী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি, খেলাপি বিনিয়োগ বাড়ায় বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়া এবং অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকে আয় হ্রাস পাওয়ায় এই বড় ধরনের লোকসান হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের সম্পদের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপের ঋণে আটকে থাকায় সেখান থেকে কোনো আয় আসছে না। অথচ আমানতকারীদের প্রাপ্য মুনাফা নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকের মোট আমানত প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা হলেও এর মধ্যে কার্যকরভাবে আয় আসছে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি পরিকল্পনাধীন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলো গ্রহণ করে অথবা বিশেষ নীতিগত সুবিধা দেয়, তাহলে ব্যাংকের আর্থিক সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, গত দুই দিনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হলে গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়বে এবং করপোরেট আমানত সংগ্রহ সহজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে আদায় না হওয়া অর্থ আয় হিসেবে দেখানো যায় না; বরং তা সাসপেন্স হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়। ভবিষ্যতে এসব অর্থ আদায় করা গেলে ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
অন্যদিকে একই সময়ে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে ৮ টাকা ৬৮ পয়সা হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫ টাকা ৮৭ পয়সা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে এপ্রিল-জুন সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ২০ পয়সা।
লোকসানের প্রভাবে আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ৩ টাকা ৬৯ পয়সায় নেমে এসেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ১২ টাকা ৩৪ পয়সা।
ব্যাংকটির মতে, পরিচালন লোকসান বৃদ্ধি এবং সম্পদের মানের উল্লেখযোগ্য অবনতির কারণেই আয়, নগদ প্রবাহ এবং নিট সম্পদমূল্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসার কারণে দেশের কয়েকটি বড় ব্যাংকের আর্থিক চাপে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতে সংস্কার জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
পাঠকের মন্তব্য