![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে টানা দুই সপ্তাহের সামরিক অভিযানের পর নতুন কৌশলের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের অঞ্চলে বিমান হামলা আপাতত বন্ধ রাখার সুপারিশ করেছেন। তার মূল্যায়ন, চলমান সামরিক অভিযান কার্যকারিতার প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে এবং শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে বাকি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অ্যাডমিরাল কুপারের এই সুপারিশই শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সামরিক ও বেসামরিক উপদেষ্টারাও মত দেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে কেবল বিমান হামলা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
দুই সপ্তাহ পর হামলায় বিরতি
টানা দুই সপ্তাহের সামরিক উত্তেজনার পর প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালি ও ইরানের দক্ষিণ উপকূলে নতুন করে হামলা না চালানোর নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকের আগ পর্যন্ত ট্রাম্প আরও বড় পরিসরের সামরিক অভিযানের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর পরিস্থিতির মূল্যায়নে পরিবর্তন আসে এবং শেষ পর্যন্ত শুক্রবার হামলা সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তু ইতোমধ্যেই ধ্বংস
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, গত দুই সপ্তাহের হামলায় ইরানের নৌ-সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, অভিযানের জন্য পূর্বনির্ধারিত অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তু ইতোমধ্যেই ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে হলে নতুন করে বড় আকারের সামরিক অভিযান প্রয়োজন হবে। তবে সে ধরনের পূর্ণাঙ্গ অভিযান ছাড়া সীমিত বিমান হামলা অব্যাহত রাখার কৌশল কার্যকর হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি বলেছেন, আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব অভ্যন্তরীণ সামরিক পরামর্শ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
সামরিক উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তবে সম্ভাব্য সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটনের অবস্থানের ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী ধাপ অনেকটাই নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা জোরদার এবং নৌপথে সম্ভাব্য মাইন অপসারণে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সম্মেলনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সব ধরনের কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখলেও অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথও সচল রেখেছে। তার ভাষায়, সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় পর্যায়েই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত হলেও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আলোচনায় অগ্রগতি না হলে কিংবা নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য