
ইবি রিপোর্ট
দেশের খাদ্য উৎপাদক পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় ধীরে ধীরে পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠছে। ঘর নির্মাণে স্থায়ী উপকরণের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সুবিধাও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ খাদ্য উৎপাদক পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। আর ৯৪ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকের আয় ও উৎপাদনশীলতা’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনটি আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশ করে বিবিএস। এতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ—উভয় ধরনের খাদ্য উৎপাদক পরিবারের আবাসন, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বে ছিলেন টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্পের পরিচালক। প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে আবাসন, মৌলিক পরিষেবা, শিক্ষাগত অবস্থা ও জমির মালিকানার মতো সূচক বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব সূচক পরিবারের সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্যের চিত্র তুলে ধরে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য উৎপাদক পরিবারের ঘরের মেঝেতে স্থায়ী নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে। জাতীয়ভাবে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের মেঝে ইট-কংক্রিট ও সিমেন্টের। ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৪৩ শতাংশ। বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের মধ্যে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশের মেঝেতে এসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
মেঝেতে টাইলসের ব্যবহার জাতীয়ভাবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। কাঠের মেঝে জাতীয়ভাবে ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে পাওয়া গেছে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় ধরনের উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রেই এ হার সমান। বাঁশের মেঝে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের।
ঘরের দেয়ালেও স্থায়ী নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে। জাতীয়ভাবে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ খাদ্য উৎপাদক পরিবারের দেয়াল ইট, সিমেন্ট ও কংক্রিটের। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে জরিপে এ হার ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
দেয়ালে টাইলসের ব্যবহার জাতীয়ভাবে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে তা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে দেয়াল নির্মাণে টিনের ব্যবহার এখনও উল্লেখযোগ্য। জাতীয়ভাবে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারের দেয়ালে ঢেউটিন বা স্টিলের টিন রয়েছে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
মাটির দেয়াল রয়েছে জাতীয়ভাবে ৬ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ। বাঁশ ও খড়ের দেয়াল রয়েছে জাতীয়ভাবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
ছাদের ক্ষেত্রে টিনই এখনো প্রধান নির্মাণসামগ্রী। জাতীয়ভাবে ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ খাদ্য উৎপাদক পরিবার টিনের ছাদ ব্যবহার করে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে কংক্রিট ও সিমেন্টের ছাদের ব্যবহারও রয়েছে। জাতীয়ভাবে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ কৃষক পরিবার এ ধরনের ছাদ ব্যবহার করে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এ হিসাবে ছাদ নির্মাণে বৃহৎ উৎপাদক পরিবার তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে।
খড়, গোলপাতা ও তালপাতার ছাদ এখন মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের মধ্যে রয়েছে। হাতের তৈরি টাইলসের ছাদ জাতীয়ভাবে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পরিবারে দেখা গেছে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। জাতীয়ভাবে ৯৪ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
সাপ্লাইয়ের পানি ব্যবহার করে জাতীয়ভাবে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ইন্দারা, পুকুর, নদী, খাল ও লেকের পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কমেছে। সংগ্রহ করা বৃষ্টির পানির ব্যবহারও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও কম ব্যবধান দেখা গেছে। জাতীয়ভাবে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ খাদ্য উৎপাদক পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৯৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের ক্ষেত্রে ৯৮ শতাংশ।
জরিপের সামগ্রিক তথ্য বলছে, কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন শুধু ঘরবাড়ির নির্মাণসামগ্রীতে সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎ ও টিউবওয়েলের পানির মতো মৌলিক সুবিধার ব্যবহারও ব্যাপক হয়েছে। আবাসনের কিছু ক্ষেত্রে বৃহৎ উৎপাদক পরিবার এগিয়ে থাকলেও পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উৎপাদক পরিবারের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম।