![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতের একের পর এক নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চিত চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে দেশটির তরুণ সমাজ। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজে আয়োজিত এক বিশাল ছাত্র-যুব সমাবেশে, যেখানে হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তায় নেমে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান। আন্দোলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর প্রকাশ হলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রয়াগরাজের অল সেন্টস ক্যাথেড্রালের কাছে আয়োজিত সমাবেশে শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে নানা ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান ও পোস্টার প্রদর্শন করেন। সবচেয়ে আলোচিত পোস্টারগুলোর একটিতে লেখা ছিল, “আপনাদের এখানে হয়তো চায়ে বিস্কুট ডুবে যায়, কিন্তু আমাদের এখানে চায়ের মধ্যে পুরো দেশ ডুবে গেছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক সংকটের প্রতি তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন।
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুইটি জয়সওয়াল বলেন, “আমরা মেয়েরা আর কাউকে ভয় পাই না। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে এসেছি। আমাদের ভয় দেখিয়ে আর থামানো যাবে না।” তিনি জানান, একসময় তিনি বিজেপির সমর্থক ছিলেন, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষোভ
উত্তর প্রদেশে গত কয়েক বছরে একাধিক সরকারি চাকরির পরীক্ষা এবং ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালে কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা এবং পর্যালোচনা কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২৬ সালে লেখপাল নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে, যা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী অলোক বলেন, একটি নিয়োগ পরীক্ষার ফল চূড়ান্ত হতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়, যা তরুণদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। আদালতে মামলা, পরীক্ষা বাতিল এবং পুনরায় পরীক্ষা—সব মিলিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম চাপের মুখে পড়ছেন।
নিট পরীক্ষার প্রভাবও স্পষ্ট
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস তাদের জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
উপপরিদর্শক (দারোগা) নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া অশোক প্যাটেল বলেন, তার ছোট ভাই নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আবার পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে। একইভাবে তিনিও পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের শিকার হয়েছেন। তার ভাষায়, “একটি মধ্যবিত্ত পরিবার আর কত বছর এভাবে অপেক্ষা করতে পারে?”
অন্যদিকে স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী অপর্ণা বলেন, যখন জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়ে যায়, তখন ভবিষ্যতের কোনো পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়েই আর ভরসা থাকে না।
তরুণদের নতুন প্রতিবাদ
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া প্রথমবারের আন্দোলনকারী আকাঙ্ক্ষা দ্বিবেদী একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার বহন করেন, যেখানে লেখা ছিল, “কুচু পুচু, এবার তো পদত্যাগ করুন।” তার মতে, প্রতিবার পরীক্ষা স্থগিত বা বাতিল হলে শুধু সময় নয়, শিক্ষার্থীদের পরিবারের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
শিক্ষার্থী সংগঠন দিশা জানায়, দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের সংগঠিত হতে অনুপ্রাণিত করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারত।
স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার দাবি
প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সংগঠন সংযুক্ত প্রতিযোগী ছাত্র হুঙ্কার মঞ্চ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
স্মারকলিপিতে লেখপাল নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি চাকরির নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গ্রুপ-বি ও গ্রুপ-সি পদে পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ভারতের তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে তুলছে। এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে শিক্ষার্থী আন্দোলনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পাঠকের মন্তব্য