
ইবি রিপোর্ট
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা নির্ধারিত ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে।
এ ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশে প্যাকেজ ভ্যাটের প্রচলন ছিল। তখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের মাসে নির্ধারিত হারে ভ্যাট দিতে হতো। এ ব্যবস্থা ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ নামে পরিচিত ছিল।
২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন চালুর পর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তবে এবার অনেকটাই একই ধরনের নির্ধারিত ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মাসে ন্যূনতম ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর এই ভ্যাট আরোপ করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
এনবিআরের সংগ্রহ করা একটি তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নুর নাহার প্লাজায় মোট ৫২টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি রয়েছে এমন দোকানের সংখ্যা চারটি।
অন্যদিকে, রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে দোকানের সংখ্যা ১২১টি এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী বাজারে রয়েছে ৫০টি দোকান।
এভাবেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা পর্যায়ের বাজারগুলোর দোকানপাটের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করছে এনবিআর। দোকানের ধরন, অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ৩ থেকে ৫ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এই নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপজেলা পর্যায়ের বাজারের নাম, বিপণিবিতান এবং দোকানের তালিকা ইতিমধ্যে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে আসতে শুরু করেছে। এখন ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর নির্ধারিত ভ্যাটের হার চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারেন, সে জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রান্তিক পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের জন্য আলাদা অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চেষ্টা করা হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা।
এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করতে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রয় বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এ ধরনের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হয়।
অন্যদিকে, যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার নিচে, তাদের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়। এই পরিস্থিতিতে ন্যূনতম ভ্যাটের বিধান চালুর মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে চায় এনবিআর।
প্রস্তাবিত উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তবে তিনি মনে করেন, মাঠপর্যায়ে এ ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটি বড় বিষয়। এজন্য প্রথমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ভ্যাট ব্যবস্থাকে ভয় হিসেবে না দেখেন।
স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি শুরু থেকেই কম পরিমাণের ভ্যাট দেওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যান, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণ ভ্যাট আদায় করা কঠিন হতে পারে।
এ কারণে ন্যূনতম ভ্যাট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়েও কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এনবিআরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে আলাদা অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা থাকায় প্রান্তিক পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ উদ্যোগ সফল করতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, ভ্যাট ব্যবস্থার নিয়ম সহজভাবে বোঝানো এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় নতুন ভ্যাট ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভ্যাটের আওতা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে চায় এনবিআর। এখন মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা এবং নির্ধারিত ভ্যাটের হার চূড়ান্ত করার পর এ পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
পাঠকের মন্তব্য