![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
একটি ভিডিও কখনো কখনো এমন একটি প্রশ্ন সামনে এনে দেয়, যা আমরা দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ছয় মিনিটের একটি ভিডিওও তেমনই এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন শিশুকে এক শিক্ষক নির্মমভাবে প্রহার করছেন। ভিডিওটির স্থান, সময় কিংবা সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও দৃশ্যগুলো যে কোনো বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করে। একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার নামে একটি শিশুর ওপর এমন সহিংস আচরণ করতে পারেন—এই প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা ঘটলে সেই শিশুর পাশে দাঁড়াবে কে?
এই প্রশ্ন কোনো একটি মাদ্রাসা, কোনো একজন শিক্ষক কিংবা কোনো একটি ভাইরাল ভিডিওকে ঘিরে নয়। এটি বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি ও নজরদারির কাঠামো নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের অনীহার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষা ধারা নয়; এটি লাখো পরিবারের বাস্তবতা। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর বাইরে আরও কয়েকটি কওমি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আবাসিক। অনেকেই দরিদ্র, অতিদরিদ্র কিংবা এতিম পরিবারের সন্তান। অনেক অভিভাবক সীমিত সামর্থ্যের কারণে সন্তানকে মাদ্রাসায় রেখে নিশ্চিন্ত হতে চান। তাঁদের বিশ্বাস, সন্তান সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা পাবে, নৈতিক মানুষ হয়ে উঠবে, নিরাপদ পরিবেশে বড় হবে।
কিন্তু সেই নিরাপত্তার জায়গাটিই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তাহলে উদ্বেগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই কি দায় শেষ?
বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা এলাকায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কয়েকজন মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অবশ্যই একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আইনের শাসনের স্বার্থে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়া জরুরি।
কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সেটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল অবস্থান হতে পারে না। কারণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা একবার হতে পারে, দুইবারও হতে পারে; কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি নিয়মিত ফিরে আসে, তাহলে সেখানে কাঠামোগত দুর্বলতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে জটিল দিক হলো, অধিকাংশ ঘটনাই কখনো প্রকাশ্যে আসে না।
আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকা একটি শিশু অনেক সময় জানেই না, তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। সে ভয় পায়। শিক্ষককে ভয়, প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার ভয়, পরিবারের প্রতিক্রিয়ার ভয়—সব মিলিয়ে সে নীরব থাকে। অনেক সময় অপরাধী এই ভয়কেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
অভিভাবকদের অবস্থাও সহজ নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে আপসের চেষ্টা হয়—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
ফলে যে সংখ্যক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত—”মার না খেলে মানুষ হয় না।” অথচ শিশু মনোবিজ্ঞান বহু আগেই দেখিয়েছে, ভয়ভিত্তিক শিক্ষা সাময়িক আনুগত্য তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও মানসিক সুস্থতার ক্ষতি করে।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ২০১১ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে পরিপত্র জারি করেছে।
প্রশ্ন হলো, এই নীতিগুলো কওমি মাদ্রাসাগুলোতে কতটা কার্যকর? যদি কার্যকর না হয়, তবে তার কারণ কী? পর্যবেক্ষণের অভাব, সচেতনতার ঘাটতি, নাকি জবাবদিহির দুর্বলতা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
রাষ্ট্র কি দায় এড়াতে পারে?
অনেকে যুক্তি দেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয় না এবং ঐতিহাসিকভাবে সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু এই যুক্তি শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
কারণ একটি শিশু প্রথমে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী নয়; সে রাষ্ট্রের নাগরিক। তার জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। সেখানে শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন ও অবহেলা থেকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয়, প্রশাসনিক কাঠামো বা অর্থায়নের ধরন শিশু সুরক্ষার বাধা হতে পারে না।
শিশুর অধিকার সর্বজনীন। এই নীতির কোনো ব্যতিক্রম নেই।
এখানে আরেকটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। কওমি মাদ্রাসা মানেই নির্যাতনের স্থান—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেখিয়ে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকে অস্বীকার করাও সমানভাবে ভুল।
দেশের অসংখ্য কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকরা নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দিচ্ছেন। বহু শিক্ষার্থী সেখান থেকে সুশিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জন করছে। তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে অপরাধ আড়াল করার সংস্কৃতি আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনে। কারণ এতে শুধু একটি শিশুই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পুরো প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যায়।
প্রকৃতপক্ষে জবাবদিহি একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
কী করা যেতে পারে?
সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমাধানের পথও স্পষ্ট করতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গুরুতর অভিযোগ তদন্তে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আপসের সুযোগ রাখা যাবে না। আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য শিশু মনোবিজ্ঞান, ইতিবাচক শৃঙ্খলা, শিশু অধিকার ও সহিংসতামুক্ত শিক্ষাপদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক আচরণ একে অপরের পরিপূরক—এ কথাটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চতুর্থত, কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর ভূমিকাও সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন। শুধু পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। অভিযোগের অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য কার্যকর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
সবশেষে, অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তান যদি আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন আনে, ভয় পায়, কথা বলতে না চায় কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করে, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি মমতা, কোমলতা ও ভালোবাসার যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়। ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য কখনো ভয় সৃষ্টি করা নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ দেখানো।
তাই শাসনের নামে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
অভিভাবকেরা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান মানুষ হওয়ার জন্য। তাঁরা চান, সন্তান জ্ঞান অর্জন করুক, ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে উঠুক, সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষ হোক। কোনো বাবা-মা চান না, সন্তান নির্যাতনের শিকার হয়ে আতঙ্ক নিয়ে বড় হোক কিংবা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিথর দেহ হয়ে ঘরে ফিরুক।
এই কারণেই কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি শিশুদের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রশ্ন।
একটি শিশু স্কুলে পড়ুক, কলেজে পড়ুক কিংবা মাদ্রাসায়—তার অধিকার সমান। সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হোক বা সচ্ছল পরিবারের, এতিম হোক কিংবা অভিভাবকের সান্নিধ্যে বড় হোক—তার নিরাপত্তার অধিকারও সমান।
কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর কয়েক দিনের আলোচনায় এই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কার্যকর তদারকি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটি সামাজিক মানসিকতা, যেখানে একটি শিশুর কান্না কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে কখনো ছোট হবে না।
কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন, প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অবকাঠামো দিয়ে শুধু নির্ধারিত হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক—একটি শিশুকে—সে কতটা নিরাপদ রাখতে পারছে, তার ওপর। কওমি মাদ্রাসার শিশুরাও এই দেশের সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব।
পাঠকের মন্তব্য