![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আনোয়ারায় শুরু হচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, আসছে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আশা
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষার পর অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল প্রতীক্ষিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) প্রকল্পের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। আগামীকাল (২৭ জুলাই) প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীনের অন্যতম বৃহৎ যৌথ শিল্প ও বিনিয়োগ উদ্যোগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশে আসবে। পাশাপাশি ১ লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করবে।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে থাকছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
আগামীকাল সকাল ১০টায় আনোয়ারার প্রকল্প এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
প্রায় ৮০০ একরজুড়ে গড়ে উঠছে শিল্পাঞ্চল
সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের মতে, এই অঞ্চল চালু হলে রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়ীদের বড় প্রত্যাশা
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বর্তমানে পোশাকশিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়। যদি এসব উপকরণ সিইআইজেডে উৎপাদিত হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
বিভিন্ন খাতে আসবে নতুন বিনিয়োগ
কর্মকর্তাদের আশা, উন্নত টেক্সটাইল, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশীয় ও অন্যান্য বিদেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ করবেন।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর প্রকল্পে গতি
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একাধিক বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর বেজা এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) প্রকল্প উন্নয়নের জন্য ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় করে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি সিইআইজেডে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তার মতে, এই অগ্রগতি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
৪,১৮৯ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন
প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীন সরকারের রেয়াতি ঋণ থেকে এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে।
এই অবকাঠামোর আওতায় নির্মাণ করা হবে জেটি সংযোগ সড়ক, চার লেনের সড়ক, সেতু, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), বহুমুখী জেটি, গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, জলাধার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর।
কৌশলগত অবস্থানের বড় সুবিধা
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সিইআইজেড শক্তিশালী যোগাযোগ ও লজিস্টিক সুবিধা পাবে। ফলে এটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। ২০২২ সালে চীন সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-কে ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে আসে।
পাঠকের মন্তব্য