
ইবি রিপোর্ট
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার কষাঘাতে বেসামাল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি। চড়া দামে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় বিপিসি ও পেট্রোবাংলার ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ। সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট এখন সরবরাহের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলাকে এই পরিস্থিতির বড় মাশুল দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে জ্বালানি কিনলেও দেশের বাজারে তা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বাড়ছে।
গত আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসানের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল কেনার পর দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় এই লোকসান হয়েছে। জ্বালানি তেলের বাজারে আন্তর্জাতিক দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপও বাড়ছে।
এলএনজি আমদানিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চড়া দামে এলএনজি আমদানি করে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ফলে জ্বালানি খাতের ব্যয় সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। আর আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার মাশুল সরাসরি দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় উচ্চমূল্যের প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট সরকারের জনপ্রিয়তার ওপরও আঘাত করেছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে বিপিসির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সরকার সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাজারটি আংশিকভাবে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এর আওতায় বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জ্বালানি তেলের বাজারে যুক্ত করা হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে বিপিসির ওপর থাকা একক নির্ভরতা কমানোর পথও তৈরি হবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে।
জ্বালানি বাজার আংশিকভাবে বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করার এই উদ্যোগকে বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের বাজারে বিপিসির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বর্তমান সংকটের মধ্যে সেই কাঠামোয় পরিবর্তন এনে সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
তবে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নতুন নীতিমালা কতটা বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগ করা যায় তার ওপর। কারণ একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব—দুই ধরনের চাপই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।