![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জন্য মোদি সরকারই দায়ী: সোনিয়া গান্ধী
ভারতে প্রশ্নফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থা এবং সরকারের জবাবদিহির অভাবই দেশটির শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে সংলাপে না গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের কার্যত ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-তে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী কলামে সোনিয়া গান্ধী বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংকটের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তাদের মূল দাবি ছিল শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর দমননীতি।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশি শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ
সোনিয়া গান্ধীর দাবি, গত ২০ জুলাই দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ চালায়। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এমনকি আন্দোলন শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও অনেককে লাঠিপেটা ও পেলেট গানের ছররার মুখে পড়তে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষায়, এ ধরনের অভিযান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। ওই দিনের ভিডিওচিত্র দেশবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘ভিন্নমতকে দেশবিরোধী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে’
সোনিয়া গান্ধীর মতে, মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশল হলো ভিন্নমতকে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। আন্দোলনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়িয়ে আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিবর্তে বলপ্রয়োগ কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শিক্ষা খাতে বাজেট কমানোর অভিযোগ
কলামে সোনিয়া গান্ধী দাবি করেন, মোদি সরকার ধীরে ধীরে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে এনেছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, স্কুল শিক্ষার বাজেট প্রায় ৫০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষার বাজেট ৩৩ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, গত ১২ বছরে প্রায় এক লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে ৪৩ হাজার নতুন বেসরকারি স্কুল চালুর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশ পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও তাদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
বিশ্ববিদ্যালয় ও পরীক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা
সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ধীরে ধীরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুদান কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং সেই চাপ শিক্ষার্থীদের বাড়তি ফি হিসেবে বহন করতে হচ্ছে। এতে উচ্চশিক্ষা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরীক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতের জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত, বেসরকারীকরণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) জনবল সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতায় ভুগছে এবং পরীক্ষা পরিচালনায় অতিরিক্তভাবে বেসরকারি ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, গত ১২ বছরে ভারতে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘটনা ঘটেছে এনটিএ গঠনের পর, যা মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বেকারত্ব ও জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়েও প্রশ্ন
সোনিয়া গান্ধী বলেন, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ মানসম্মত চাকরি পাচ্ছেন না। তার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাতীয় ঐকমত্য কিংবা সংসদীয় আলোচনার বাইরে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একইভাবে এনটিএকেও যথাযথ সংসদীয় জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
‘আন্দোলনের মূল কারণ সরকারের ব্যর্থতা’
কলামের শেষাংশে সোনিয়া গান্ধী বলেন, বর্তমান শিক্ষা সংকট, সরকারের দায়বদ্ধতার অভাব এবং প্রশাসনের কঠোর মনোভাবই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল কারণ। তার মতে, সরকারের উচিত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমন না করে তাদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
উল্লেখ্য, এসব মন্তব্য সোনিয়া গান্ধীর দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত মতামতধর্মী কলামের অংশ। এতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
পাঠকের মন্তব্য