ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামোর বড় ব্যবধান দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে এসব মন্তব্য করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক দৈনিক বণিক বার্তা এ আয়োজন করে।
জ্যঁ পেম বলেন, জ্বালানি শুধু একটি খাতের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমানে জ্বালানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন সরাসরি দেশের জ্বালানি ব্যয় ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাস এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তির কারণে সরকারের আর্থিক দায়ও বাড়ছে।
চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক চারটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে।
প্রথমত, আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি খাতে কার্যকর ট্যারিফ ও নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ। তৃতীয়ত, সবুজ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং জলবায়ু সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা। চতুর্থত, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে গ্যাসের ভ্যালু চেইনকে আরও শক্তিশালী করা।
জ্যঁ পেম বলেন, বর্তমানে জ্বালানি ভর্তুকির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ। এই ব্যয় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
তিনি মনে করেন, ধাপে ধাপে ট্যারিফ সমন্বয়ের একটি স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে এই প্রক্রিয়ায় নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎসের বৈচিত্র্য অপরিহার্য। ভুটান ও নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করলে তুলনামূলক কম খরচে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশের সরকারি মালিকানাধীন জমিতে বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।
তার মতে, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর, রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি এবং অন্যান্য সরকারি জমিতে গিগাওয়াট-স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ পার্ক নির্মাণ করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সঠিক নীতিমালা, বিনিয়োগবান্ধব ট্যারিফ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে অল্প সময়েই বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ অনুসরণযোগ্য।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে এখনই কার্যকর সংস্কার, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবেই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও শক্তিশালী হবে।
পাঠকের মন্তব্য