![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ফুটবল ইতিহাসের এক যুগের অবসান আর আরেক নতুন যুগের সূচনা—২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল যেন এক মঞ্চেই দেখল দুই প্রজন্মের সেই আবেগঘন মুহূর্ত। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসের মাঝেই কোটি কোটি দর্শকের নজর কাড়ে লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের একটি আলিঙ্গন। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি মেসি, অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের নতুন তারকা লামিন ইয়ামাল।
অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ জিতে নেয় স্পেন। ম্যাচ শেষে যখন স্প্যানিশ ফুটবলাররা শিরোপা উদযাপনে ব্যস্ত, তখন ইয়ামাল এগিয়ে গিয়ে আলিঙ্গন করেন শৈশবের আদর্শ লিওনেল মেসিকে। সেই দৃশ্য মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
তবে মেসি ও ইয়ামালের এই গল্পের শুরু আজকের নয়। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। বার্সেলোনার একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগটি লটারির মাধ্যমে পেয়েছিল ইয়ামালের পরিবার। সেই ছবিতে নীল রঙের একটি ছোট্ট গামলায় শিশুকে গোসল করাতে সহায়তা করতে দেখা যায় মেসিকে।
বছরের পর বছর ধরে ছবিটি ছিল একটি স্মৃতিমাত্র। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসি ও ইয়ামালের মুখোমুখি লড়াইয়ের পর সেটিই যেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ছবিতে পরিণত হয়েছে।
ফাইনালের আগে এক অনুষ্ঠানে মেসিও সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি যখন ইয়ামালের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন, তখন সে ছিল একেবারে শিশু। আজ একই বিশ্বকাপ ফাইনালে দুজনের মাঠে নামা সত্যিই অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন ইয়ামাল। যদিও ফাইনালে তার নাম স্কোরশিটে ওঠেনি, তবে ডান প্রান্ত দিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে রেখেছিলেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং এবং সৃজনশীল ফুটবল স্পেনের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
ইউরো ২০২৪ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপ শিরোপাও জিতে নিজের অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ দিলেন এই তরুণ উইঙ্গার। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে ইয়ামাল এখন জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার।
মাঠের বাইরেও মানবিক অবস্থানের জন্য আলোচনায় রয়েছেন ইয়ামাল। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয়ের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শনের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তার এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। পরে গাজার একটি শরণার্থী শিবিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপে ইয়ামালকে সম্মান জানিয়ে একটি ম্যুরালও আঁকেন ফিলিস্তিনি শিল্পীরা।
এ ছাড়া বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধেও একাধিকবার প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন স্পেনের এই তরুণ তারকা। মুসলিম পরিচয়ের কারণে স্টেডিয়ামে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান শোনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট ভাষায় এর নিন্দা জানিয়েছিলেন।
বিশ্ব ফুটবলে মেসির উত্তরসূরি কে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যামও মন্তব্য করেছিলেন, মেসির সঙ্গে কারও তুলনা চলে না, তবে বর্তমান প্রজন্মে ইয়ামালই সেই বিরল প্রতিভা, যার খেলায় তিনি মেসির ছায়া দেখতে পান।
অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল হতে পারে বলেও জোর গুঞ্জন রয়েছে। ম্যাচ শেষে আবেগঘন বিদায়ের মুহূর্তে মেসির চোখে ছিল অপূর্ণতার বেদনা, আর ইয়ামালের চোখে ছিল নতুন স্বপ্নের দীপ্তি।
ফুটবলের ইতিহাসে প্রজন্ম বদলের এমন প্রতীকী মুহূর্ত খুব কমই দেখা যায়। যে শিশুকে একদিন কোলে নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি, সেই শিশুই আজ বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল বিশ্বের নতুন নায়ক। সময়ই বলে দেবে ইয়ামাল মেসির অর্জনের কতটা কাছে পৌঁছাতে পারবেন। তবে আপাতত বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তরুণ নক্ষত্র হিসেবে নিজের নামটি তিনি স্থায়ীভাবেই লিখে ফেলেছেন।