![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের ওষুধ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলা মূল্য অনুমোদনের জটিলতা এখন বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক ও আইনি জটের কারণে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি শত শত নতুন ওষুধ এখনো বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একদিকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ, গবেষণা ও উৎপাদন সম্প্রসারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম সফল রপ্তানিমুখী শিল্পখাত।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর ধরে নতুন ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও চূড়ান্ত বাজারজাতকরণের অনুমোদন কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। এর ফলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, হাঁপানি, বন্ধ্যাত্ব, মারাত্মক ছত্রাকজনিত সংক্রমণসহ জটিল নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আধুনিক ওষুধ রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং গবেষণায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও অনুমোদনের অভাবে সেসব পণ্য গুদামেই পড়ে আছে। এতে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতিই নয়, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও পিছিয়ে পড়ছে।
এর অন্যতম উদাহরণ হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি নিভোলুম্যাব (Nivolumab)। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধটি দেশে উৎপাদন করা হলেও মূল্য অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো রোগীদের হাতে পৌঁছায়নি। অথচ এটি মেলানোমা, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, পাকস্থলী ও কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত।
ওষুধ শিল্পের নেতারা বলছেন, বর্তমান সংকট এখন শুধু শিল্পখাতের সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও রোগীদের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, যেসব রোগী সামর্থ্যবান তারা বিদেশি ওষুধ আমদানি করে চিকিৎসা নিতে পারলেও অধিকাংশ মানুষ তুলনামূলক সাশ্রয়ী দেশীয় বিকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংকট আরও গভীর হয় গত বছরের আগস্টে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) করা এক রিটের পর হাইকোর্ট সব জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য সরকারকে নির্ধারণ করার নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই নতুন ওষুধের মূল্য নির্ধারণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করছে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাকির হোসেন বলেন, আগে কিছু ওষুধের দাম নির্ধারণে বিলম্ব হলেও আদালতের নির্দেশের পর প্রায় সব নতুন ওষুধের অনুমোদন আটকে গেছে। ফলে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকা বহু ওষুধ বাজারে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় প্রতিটি ওষুধ কোম্পানির ২০ থেকে ৩০টির বেশি নতুন ওষুধ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ১৮টি, রেনাটার প্রায় ২০টি, এসিআইয়ের ২৭টি, অপসোনিনের ২৪টি এবং ইনসেপ্টা ও স্কয়ারের ২৫ থেকে ৩০টি করে নতুন ওষুধ এখনো বাজারজাত করা যায়নি।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন ওষুধ বাজারে আসেনি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রোগীরা, কারণ তারা আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে শুধু নতুন ওষুধ নয়, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম কমে যাওয়ায় কিছু ওষুধের মূল্য কমানোর আবেদনও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস জানিয়েছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আধুনিক ইনজেকশনসহ কয়েকটি ওষুধের দাম কমানোর আবেদন প্রায় এক বছর ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) অবশ্য বলছে, এই জটিলতার বড় অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, আইন অনুযায়ী মূল্য অনুমোদনের জন্য একাধিক কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন। কিন্তু নতুন ওষুধের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদানকারী ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি (ডিসিসি) প্রায় দুই বছর ধরে বৈঠক করতে পারেনি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও কমিটি পুরোপুরি পুনর্গঠন না হওয়ায় অনুমোদন প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।
ডিজিডিএ জানিয়েছে, জট নিরসনে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কমিটি পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা দূর করা না গেলে দেশের ওষুধ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমে যাবে, গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। তাই রোগীদের স্বার্থ, শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে দ্রুত মূল্য অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার বিকল্প নেই।
পাঠকের মন্তব্য