![]()
বাংলাদেশে কর আদায় নিয়ে আলোচনায় সাধারণত দুটি বিপরীত বাস্তবতা একসঙ্গে উপস্থিত। একদিকে সরকারের ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে ব্যবসায়ী সমাজের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—কর প্রশাসনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ক্ষমতার ব্যবহার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রবিবার উৎসে কর কর্তন তদারকি জোরদার করতে কর কর্মকর্তাদের জন্য যে পাঁচটি নির্দেশনা জারি করেছে, সেটি এই দুই বাস্তবতাকে নতুন করে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার, হিসাবপত্র ও ব্যাংক তথ্য পরীক্ষা, ডিজিটাল রেকর্ডে প্রবেশ, প্রয়োজনে নথি বা ডিভাইস জব্দ করা এবং তথ্যের কপি সংগ্রহ করা। এগুলো আয়কর আইন ২০২৩–এর ধারা ১৪৭–এর আওতায় দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআর জানিয়েছে। আইনগত ভিত্তি থাকলেও প্রশ্ন উঠছে—এই ক্ষমতার প্রয়োগ কীভাবে হবে? এটি কি কর ফাঁকি রোধে কার্যকর হবে, নাকি ব্যবসায়িক পরিবেশে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, উৎসে কর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এনবিআর কেন হঠাৎ এ খাতে এত গুরুত্ব দিচ্ছে।
কেন উৎসে কর এত গুরুত্বপূর্ণ:
বাংলাদেশের করব্যবস্থায় উৎসে কর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বেতন, ঠিকাদারি বিল, ভাড়া, পেশাগত সেবা, কমিশন, আমদানি–রপ্তানি লেনদেনসহ নানা ক্ষেত্রে আয় হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট পরিমাণ কর কেটে সরকারকে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে সরকার তুলনামূলক সহজে রাজস্ব পায় এবং করদাতার আয় গোপন করার সুযোগ কিছুটা কমে।
বাস্তবে দেখা যায়, দেশের মোট আয়কর আদায়ের বড় অংশই আসে উৎসে কর থেকে। কারণ বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় আয়কর রিটার্ন দাখিল ও প্রকৃত আয় প্রদর্শনের সংস্কৃতি এখনো সীমিত। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দিলেও সব লেনদেন সঠিকভাবে দেখানো হয় না। ফলে উৎসে কর সরকারের জন্য এক ধরনের ‘নিশ্চিত রাজস্বের উৎস’।
কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মচারী, সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের বিল থেকে কর কেটে রাখলেও সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না। আবার কোথাও কম হারে কর কাটা হয়, কোথাও ভুয়া চালান বা সমন্বয়ের মাধ্যমে দায় কম দেখানো হয়। এনবিআরের ধারণা, এই খাতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে। তাই তারা মাঠপর্যায়ে যাচাই বাড়াতে চাইছে।
নতুন নির্দেশনায় কী আছে:
এনবিআরের পাঁচ নির্দেশনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো কর কর্মকর্তাদের “বিনা বাধায়” ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের ক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্যে প্রবেশের বিষয়টি। আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যবসার বড় অংশই এখন ডিজিটাল—হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার, ক্লাউড সার্ভার, ই-মেইল, অনলাইন পেমেন্ট রেকর্ড ইত্যাদি। তাই শুধু কাগুজে হিসাব দেখে প্রকৃত লেনদেন বোঝা কঠিন।
অনেক দেশেই কর কর্তৃপক্ষের ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা আছে। তবে সেখানে সাধারণত আদালতের অনুমতি, নির্দিষ্ট তদন্তের কারণ, তথ্য সুরক্ষার নিয়ম এবং জব্দকৃত ডেটা ব্যবহারের সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে। বাংলাদেশের আলোচনায় মূল উদ্বেগ এখানেই—আইনে ক্ষমতা থাকলেও এর ব্যবহার কি যথেষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত?
ব্যবসায়ী সমাজের উদ্বেগ:
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে কর প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ককে “বিশ্বাসের” নয়, বরং “সমঝোতার” সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। কর নির্ধারণে অস্পষ্টতা, একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা, বারবার নথি তলব, অডিটের নামে দীর্ঘসূত্রতা—এসব অভিযোগ নতুন নয়।
এ অবস্থায় কর কর্মকর্তারা যেকোনো সময় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারবেন—এমন ধারণা অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ তাদের আলাদা কর বিভাগ বা আইনজীবী দল থাকে না। একজন কর কর্মকর্তার উপস্থিতিই অনেক সময় কাজ বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ হলো ডিজিটাল তথ্য। একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার বা সার্ভারে শুধু কর–সম্পর্কিত তথ্যই থাকে না; থাকে গ্রাহকের তথ্য, সরবরাহ চুক্তি, মূল্য নির্ধারণ কৌশল, গবেষণা তথ্য, কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ইত্যাদি। এগুলো ফাঁস হলে ব্যবসায়িক ক্ষতি হতে পারে। তাই তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া বিস্তৃত প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কর ফাঁকি কি সত্যিই এত বড় সমস্যা?
উদ্বেগের মধ্যেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না—বাংলাদেশে কর ফাঁকি একটি বড় সমস্যা। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। সরকার বারবার করের আওতা বাড়ানোর কথা বললেও প্রকৃত করদাতার সংখ্যা সীমিত। বড় অঙ্কের লেনদেনকারী অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও কর নেটের বাইরে থেকে যায়।
উৎসে করের ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরতে মাঠপর্যায়ে যাচাই প্রয়োজন—এ কথা যুক্তিসংগত। শুধু অনলাইন রিটার্নের ওপর নির্ভর করলে অনেক তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয় না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান বছরে কয়েকশ কোটি টাকার ঠিকাদারি বিল পরিশোধ করেছে, কিন্তু উৎসে কর জমার হিসাব তার সঙ্গে মিলছে না। এমন ক্ষেত্রে সরেজমিন যাচাই ছাড়া প্রকৃত অবস্থা জানা কঠিন। অর্থাৎ প্রশ্নটি “যাচাই হবে কি হবে না” নয়; বরং “যাচাই কীভাবে হবে”।
আইনগত ক্ষমতা:
বাংলাদেশের বড় সমস্যা অনেক সময় আইনের ভাষা নয়, প্রয়োগের সংস্কৃতি। একই আইন একজন সৎ কর্মকর্তার হাতে কার্যকর প্রশাসনিক উপকরণ হতে পারে, আবার অন্য কারও হাতে হয়রানির অস্ত্রও হতে পারে। তাই কর কর্মকর্তাদের নতুন ক্ষমতা মূল্যায়নের সময় শুধু আইনি ধারা নয়, বাস্তব প্রশাসনিক পরিবেশ বিবেচনা করা জরুরি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, “বিনা বাধায় প্রবেশ” কথাটি আইনগতভাবে পরিদর্শনের অধিকার বোঝাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো কর্মকর্তা পূর্বনোটিশ ছাড়াই বারবার প্রতিষ্ঠানে যান, উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করেন বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য চান, তাহলে সেটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।
একইভাবে “পাসওয়ার্ড ভেঙে প্রবেশ” প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও প্রশ্ন হলো—কে অনুমোদন দেবে, কীভাবে ডেটা সংরক্ষণ হবে, কোন তথ্য নেওয়া যাবে, কতদিন রাখা যাবে, পরে মুছে ফেলা হবে কি না—এসব বিষয়ে কি স্পষ্ট প্রটোকল আছে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে:
উন্নত দেশগুলোতে কর কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানী ক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রের আইআরএস, যুক্তরাজ্যের এইচএমআরসি বা অস্ট্রেলিয়ার এটো—সবগুলোরই নথি চাওয়ার, অডিট করার এবং গুরুতর ক্ষেত্রে তল্লাশির ক্ষমতা আছে। তবে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:
যেমন-অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়; তল্লাশি বা ডেটা জব্দের জন্য উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন লাগে; করদাতার আইনজীবী উপস্থিত থাকার অধিকার থাকে; কোন তথ্য নেওয়া হয়েছে তার তালিকা দেওয়া হয়; তথ্য গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়; আপিল বা বিচারিক প্রতিকার সহজলভ্য থাকে।
বাংলাদেশে যদি একই ধরনের সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করা না হয়, তাহলে শুধু ক্ষমতা বাড়ানো আস্থার সংকট বাড়াতে পারে।
এই বিতর্কের একটি ইতিবাচক দিকও আছে। এনবিআর আসলে বুঝতে পেরেছে যে কর প্রশাসনকে ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের হিসাব সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হয়। ই-টিআইএন, অনলাইন রিটার্ন, ই-পেমেন্ট চালুর পর কর তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ বেড়েছে।
যদি এনবিআর ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তাহলে এলোমেলো পরিদর্শনের প্রয়োজন কমবে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎসে কর কর্তন ও জমার তথ্য ব্যাংক, ভ্যাট ও আয়কর ডেটার সঙ্গে মেলে না, শুধু সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। এতে সৎ করদাতারা কম বিরক্ত হবে এবং প্রশাসনের সম্পদও সাশ্রয় হবে।
কী করা দরকার:
কর ফাঁকি রোধ ও ব্যবসায়িক আস্থা—দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গেলে কর্মকর্তাকে লিখিত অনুমোদন ও উদ্দেশ্য দেখাতে হবে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে।
২. কোন তথ্য নেওয়া যাবে, কীভাবে কপি করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ হবে এবং তদন্ত শেষে কী হবে—এসব স্পষ্ট বিধিমালায় থাকতে হবে।
৩. জব্দ করা নথি বা ডিভাইস কতদিন রাখা যাবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর।
৪. ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যদি মনে করে কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাহলে দ্রুত অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৫. সব প্রতিষ্ঠানে অভিযান নয়; তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহজনক ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে।
আস্থা ছাড়া কর বাড়ে না:
কর আদায় শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের বিষয়। মানুষ তখনই কর দিতে আগ্রহী হয়, যখন তারা মনে করে নিয়ম সবার জন্য সমান, প্রশাসন ন্যায়সংগত এবং তথ্য নিরাপদ। বাংলাদেশে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না; কর ব্যবস্থাকে সহজ, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। একই সঙ্গে বড় কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সৎ করদাতারা বৈষম্যের শিকার বোধ না করেন।
পরিশেষে, এনবিআরের নতুন নির্দেশনা রাজস্ব প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—উৎসে কর ফাঁকি আর উপেক্ষা করা হবে না। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি অযৌক্তিক নয়; বরং রাজস্ব বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কিন্তু কর প্রশাসনের শক্তি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জবাবদিহি ও সুরক্ষাও সমানভাবে বাড়াতে হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা বা নথি জব্দ—এসব ক্ষমতা যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, লিখিত অনুমোদন, তথ্য সুরক্ষা ও কার্যকর আপিল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে সহায়ক হতে পারে। আর যদি এসব নিশ্চয়তা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে রাজস্ব বাড়ানোর বদলে ব্যবসায়িক আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পাঠকের মন্তব্য