![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতির নানা টানাপোড়েন, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর সংগ্রহের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর চাপ বাড়ছে । এই প্রেক্ষাপটে এনবিআর দেশের কর অঞ্চলগুলোর বিশেষ টিম দিয়ে দেশব্যাপী উৎসে কর কর্তন তদারকি ও যাচাই করার কার্যক্রম জোরদার করেছে। ১৯ জুলাই কর কর্মকর্তাদের জন্য এনবিআর যে পাঁচটি নির্দেশনা জারি করেছে, তা দেশের ব্যবসায়ী মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আয়কর আইন ২০২৩-এর ১৪৭ ধারার বরাত দিয়ে কর কর্মকর্তাদের যে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা একদিকে রাজস্ব ফাঁকি রোধে একটি কঠোর বার্তা, অন্যদিকে ব্যবসায়িক পরিবেশে এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
উৎসে করের গুরুত্ব:
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট সংগৃহীত প্রত্যক্ষ করের একটি সিংহভাগ আসে ‘উৎসে কর’ থেকে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আয়ের উৎসস্থলেই কর কেটে রাখা হয়, ফলে কর ফাঁকির সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান বা করদাতা উৎসে কর সঠিকভাবে কর্তন করলেও তা সরকারি কোষাগারে যথাসময়ে জমা দেন না, কিংবা হিসাবের খাতায় কারচুপি করেন। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআরের জন্য এই করের সঠিক আদায় নিশ্চিত করা জরুরি। এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর কর্মকর্তারা এখন থেকে যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে পারবেন, হিসাবের খাতা ও ব্যাংক বিবরণী তলব করতে পারবেন, এমনকি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম বা ক্লাউড সার্ভারের পাসওয়ার্ড ও এনক্রিপশন ভেঙে তথ্য পরীক্ষা করতে পারবেন। আপাতদৃষ্টিতে কর ফাঁকি রোধে এই পদক্ষেপগুলোকে সময়োপযোগী মনে হতে পারে, তবে এর প্রয়োগিক দিকটি নিয়ে গভীর ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
ডিজিটাল নজরদারি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন:
এনবিআরের নির্দেশনার ৩ নম্বর ধারাটি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। সেখানে বলা হয়েছে, কর কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম, ক্লাউড সার্ভার বা ডিজিটাল রেকর্ডে সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভাঙতে পারবেন। বর্তমান যুগ ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগ। দেশের প্রায় প্রতিটি মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এখন ক্লাউড ডাটাবেজ এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারে বা সার্ভারে শুধু কর সংক্রান্ত তথ্যই থাকে না; সেখানে তাদের ব্যবসায়িক গোপন কৌশল, গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং স্পর্শকাতর আর্থিক লেনদেনের বিবরণ থাকে। কর কর্মকর্তাদের যদি কোনো পূর্ব নোটিশ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ডিজিটাল ডিভাইসের পাসওয়ার্ড ভাঙার ঢালাও ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে তা প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এই ধরনের ডিজিটাল নজরদারির ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কর কর্মকর্তার অভাব এবং স্পর্শকাতর তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সুস্থ ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
যেকোনো আইনি সংস্কার বা কঠোর নির্দেশনার সাফল্য নির্ভর করে তার প্রয়োগকারীদের সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর। আয়কর আইনের ১৪৭ (২) ধারা অনুযায়ী, রাজস্ব আহরণের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। এটি কর কর্মকর্তাদের আইনগত সুরক্ষা দেয় ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সবসময় সরল লাইনে চলে না। বাংলাদেশের কর সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো করদাতা ও কর কর্মকর্তার মধ্যকার ‘আস্থার সংকট’। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে যে, কর প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার অন্যায্য হয়রানি এবং মনগড়া কর নির্ধারণের কারণে সাধারণ উদ্যোক্তারা কর দিতে ভয় পান। নতুন নির্দেশনায় কর কর্মকর্তাদের যে ‘বিনা বাধায় প্রবেশ’ এবং ‘নথিপত্র ও ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ’ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা যদি যথাযথ জবাবদিহিতা ছাড়া প্রয়োগ করা হয়, তবে মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সুশাসনের অভাব থাকলে এই ধরনের বিশেষ ক্ষমতা অনেক সময় ‘ইনস্পেকশন রাজ’ বা পরিদর্শনের নামে হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে, যা সৎ ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করবে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজীকরণ:
বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং ব্যবসার পরিবেশকে আরও সহজ ও গতিশীল করা। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ সূচকে কর দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হওয়া একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। কোনো দেশের কর প্রশাসন যদি অতিরিক্ত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণমূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে তা নতুন উদ্যোক্তাদের বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করে। এনবিআরের এই আকস্মিক পরিদর্শন ও তল্লাশির সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মনে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। ব্যবসার স্বাভাবিক গতি বজায় রেখে কীভাবে কর আদায় নিশ্চিত করা যায়, সেটাই হওয়া উচিত আধুনিক কর ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। কর ফাঁকিবাজদের শাস্তির আওতায় আনা অবশ্যই জরুরি, তবে সেই প্রক্রিয়ায় যেন সামগ্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
উন্নত বিশ্বের কর সংস্কৃতি ও আমাদের প্রেক্ষাপট:
উন্নত বিশ্বে কর আদায়ের প্রক্রিয়াটি মূলত প্রযুক্তি-নির্ভর এবং স্বয়ংক্রিয় । সেখানে করদাতাদের রিটার্ন বা হিসাবের খাতা যাচাই করার জন্য কর কর্মকর্তাদের সশরীরে দোকানে বা অফিসে গিয়ে পাসওয়ার্ড ভাঙার প্রয়োজন পড়ে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে করদাতাদের আয়ের উৎসের সঙ্গে ব্যয়ের অসঙ্গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়। কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে প্রথমে করদাতাকে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয় এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও এনবিআর ডিজিটাল কর ব্যবস্থার দিকে হাঁটছে, কিন্তু ই-টিডিএস বা ইলেকট্রনিক উৎসে কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও সম্ভব হয়নি। পদ্ধতিগত আধুনিকায়ন পুরোপুরি না করে কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আইনগত ক্ষমতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব:
এনবিআরের এই কঠোর অবস্থানের ফলে সাময়িকভাবে হয়তো উৎসে কর আদায়ের পরিমাণ কিছুটা বাড়বে, কিন্তু তা কি দীর্ঘমেয়াদে করের আওতা বাড়াতে সাহায্য করবে? বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন (প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ)। এর প্রধান কারণ, দেশের একটি বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা কর জালের বাইরে রয়ে গেছে। যারা নিয়মিত কর দেন বা নিবন্ধিত, তাদের ওপর নজরদারি বাড়ালে বা করের হার বৃদ্ধি করলে করের আওতা বাড়ে না; বরং নিবন্ধিত করদাতাদের ওপর করের বোঝা আরও ভারী হয়। এনবিআরের উচিত যারা কর জালের বাইরে আছেন, তাদের চিহ্নিত করা। নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক হানা দেওয়ার চেয়ে কর নেট বাড়ানো এবং কর পদ্ধতিকে সহজ করাই রাজস্ব বৃদ্ধির একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
ভবিষ্যৎ করণীয় কী:
রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এনবিআরের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্যকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেন, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, যৌক্তিক ও আধুনিক। কর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক দূর করে একটি সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. সশরীরে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তল্লাশি করার চেয়ে এনবিআরের নিজস্ব ডাটাবেজ শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং চ্যানেল এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে করদাতার ফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিংকড থাকলে কর ফাঁকি সহজেই ধরা পড়বে।
২. কর কর্মকর্তারা কখন, কীভাবে এবং কার অনুমতি নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারবেন, তার একটি স্পষ্ট এসওপি থাকতে হবে। পাসওয়ার্ড বা ক্লাউড সার্ভার পরীক্ষার আগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার লিখিত অনুমোদন এবং সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো বাধ্যতামূলক করা উচিত।
৩. কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতার যেমন আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে, তেমনি কোনো কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেন বা কোনো ব্যবসায়ীকে অন্যায্যভাবে হয়রানি করেন, তবে তার বিরুদ্ধেও দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান থাকতে হবে।
৪.কর আদায় প্রক্রিয়াকে ভীতিপ্রদ না করে করদাতাদের উৎসাহিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত ব্যবসায়ী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সাথে সংলাপের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা সম্ভব।
৫. উৎসে কর কর্তন ও জমার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইন বা কাগজের ছোঁয়া ব্যতিরেকে করা গেলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ কমে আসবে, যা দুর্নীতির সুযোগ দূর করবে।
পরিশেষে, একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কর আদায় কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি সামাজিক চুক্তি। নাগরিক বা ব্যবসায়ী সমাজ রাষ্ট্রকে কর দেবে এই প্রত্যাশায় যে, রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ দেবে। এনবিআরের নতুন নির্দেশনা কর ফাঁকি রোধে আইনগতভাবে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু এর যত্রতত্র ব্যবহার যেন সুস্থ অর্থনৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক মন্দার এই সময়ে জোরজুলুম বা ভীতি তৈরি করে সাময়িক কর আদায় বাড়ালেও তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের উন্নয়ন এবং করদাতাদের সাথে আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমেই কেবল একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। সুশাসন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক আমাদের আগামী দিনের কর সংস্কৃতি।
পাঠকের মন্তব্য